সেন্টমার্টিনে মনোমুগ্ধকর এক রাত

প্রকাশিত: ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১১:৩৯:১৫ || পরিবর্তিত: ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১১:৩৯:১৫

নাজমুল ইসলাম :বেশ কিছুদিন ধরেই সেন্টমার্টিন সফরের জন্য আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন মমিনভাই। তিনি আমার রুমমেট।  ঢাকায় আমার অভিভাবকতুল্য তিনি।  ভাইয়ের পরিকল্পনায় নভেম্বরে সেন্টমার্টিন ভ্রমণে যাবো আমরা। শত ব্যস্ততার মাঝেও রাজি হলাম। বর্তমানে ট্যুরিস্টদের খুব চাপ। পেশাগত কারণে ট্যুরিস্ট এলাকার পরিবহন এবং হোটেলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো। তাই একটু চেষ্টাতেই টিকিট এবং হোটেল বুকিং সম্পন্ন হয়ে গেলো।
আমরা যাত্রা করলাম বুধবার (২০ নভেম্বর) রাতে। চিটাগাং, কক্সবাজার হয়ে আমাদের বাস টেকনাফ পৌছালো বৃহস্পতিবার সকালে। বাস থেকে নেমেই ফজরের নামাজ মসজিদে আদায় করে নিলাম। আটল্যান্টিক জাহাজে আমাদের যাত্রা। মিরাজ ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের স্পন্সরে কাঁঠালি রংয়ের ট্রি-শার্ট গায়ে মেলে সবাই একসঙ্গে জাহাজে চড়লাম। আগেই টিকেট বুকিং ছিল। তাই একটু নিরিবিলিতে বসার ব্যবস্থাও হলো।


নাফ নদী ধরে হুমায়ূন আহমেদের দারুচিনির দ্বীপের উদ্দেশে জাহাজ চলছে। সকালের সোনা ঝরা রোদের আলোয় দূরের মিয়ানমারের পাহাড় এবং স্বচ্ছ নদীর জল। আমাদের মাঝে কথা হচ্ছে কম। সৃষ্টির সুন্দর নয়নে জড়াতেই সবাই ব্যস্ত। কিছু সময় পরে টেকনাফের সর্বশেষ ভূ-খণ্ড শাহপরী দ্বীপ পেরিয়ে নীল জলরাশির উত্তাল সমুদ্রে আমাদের জাহাজ। খাবারের সন্ধানে সীগাল পাখি জাহাজের পিছু নিয়েছে যাত্রার শুরুতেই।  
চারিদিকেই দিগন্ত হারানো নীল জলরাশি। জাহাজ চলছে মধ্যম গতিতে। রাতের ঘুম এখনো কাটেনি। তাই শুয়ে পড়লাম। তবে মনটা পড়ে আছে অতীত নামের নারিকেল জিঞ্জিরাতে। অস্থির মনে অপেক্ষায় কখন এই অপরূপ ভূমিতে পা পড়বে। এক পর্যায়ে অপেক্ষার পালা শেষ হলো। জেটিতে ভিড়লো আমাদের জাহাজ৷
আমরা নেমে হেঁটে চললাম হোটেলের উদ্দেশে। সকাল সাড়ে ১১টায় হোটেলের রুম বুঝে নিয়েছি। যাত্রা পথের ক্লান্তি দূর করতে একটু বিশ্রাম। এরপর জার্সি পরে সৈকতে গিয়ে সফরসঙ্গীরা দু'দলে ভাগ হলাম। নেমে পড়লাম ফুটবল খেলায়।
খেলা শেষ করে ঝাপিয়ে পড়লাম জোয়াড়ের লোনা জলে। গোছল, দৌড় ঝাঁপের মাঝে শতশত ছবি ওঠা হয়ে গেল। এর মাঝে রুমে এসে জোহর আসর একসঙ্গে পরে নিলাম। দুপুরের খাবার হোটেলেই। সাগরের সুস্বাদু মাছ, আলু ভর্তা, ডাল দিয়ে তৃপ্তিসহ খাওয়া হলো।  
সেন্টমার্টিনে এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি। হোটেলের রুম থেকেই সমুদ্র দেখা যায়। কিছু সময় রুমেই বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে বের হলাম সৈকতের উদ্দেশে। ভালোলাগার সময়ে তখন অনেকেরই হাত তার সঙ্গী বা সঙ্গিনীর হাতে।  থেমে থেমে ছবি তোলা হলো। কেউ আবার আলতো করে পা ভিজিয়ে নিলো সাগরের জলে। এর মাঝে আরো একটি খেলা শেষ করলাম। একযোগে সাইকেল রেস। ছোটদের মতো বিস্কুট দৌড়ে অসাধারণ মুহূর্তে গোধুলির লগ্নে খেলার পর্ব শেষ করলাম।
সন্ধ্যার পরেও সৈকতে আমরা। কিছু দূরে দোকান দেখা গেলো। চললাম সেদিকে। সঙ্গী একজনের মাছ, কাঁকড়া খুব পছন্দ। এজন্যই মূলত ওই দোকানের দিকে যাওয়া। রাতে হালকা শীত ও বাতাস। মাছের বারবিকিউ আর পরোটা অর্ডার করে অপেক্ষা করছি৷ জয়নাল মামা ও রবিন ভাই মোটা কাপড় পড়ে আছে। আমরা উপভোগ করছি আলো-আঁধারির মাঝে সাগরের বড় বড় ঢেউয়ের খেলা। রাতের সমুদ্রও যে মুগ্ধতা ছড়াতে পারে আগে জানা ছিল না। বিরামহীন ছন্দে সাগরের গর্জন সংগীতের আবহ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে আঞ্চলিক গানের আসরে মেতে উঠলাম সবাই।  
এবার রাতের খাবারের সময় হলো।  মাছের বারবিকিউ  তৈরি হচ্ছে। সাগর পাড়েই রাতের খাবার সেরে ফেললাম। বেশ রাত করেই হোটেলে ফিরে সেন্টমার্টিনে শেষ রাত্রিযাপন আমাদের।


সাগর পাড়ের হোটেলের রুমেও সুন্দর কিছু সময় পার করলাম। ভালোলাগা নিয়েই সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম নতুন সূর্যের দ্বীপ ঘুরে দেখার ইচ্ছে নিয়ে। পরের দিন খুব ভোরে উঠেই আমরা সৈকতে। যে দিকে নয়ন ফিরাই অথই নীল জলরাশি, ছন্দে চলা ঢেউ, স্নিগ্ধ বাতাস, সোনালী রোদ। দূরে দিগন্ত হারিয়েছে আর জেলেদের ট্রলার ছুটে চলেছে সেই দিগন্তের দিকে। পার করলাম ভালো লাগার কয়েক ঘণ্টা।
সকালের নাস্তা শেষ করে আবারো প্রস্তুতি হুমায়ুন আহমেদের বাসভবন ও ছেঁড়া দ্বীপের দিকে। সৈকতের জল ছুঁয়ে নাসির মামার সঙ্গে ছুটলাম মোটর সাইকেলে। থেমে থেমে চললো ফটোসেশন। ভালো সময় দ্রুত চলে যায়। সূর্য তার দিনের দায়িত্ব পালনে ব্যাস্ত। প্রখর রৌদ ও নীল সাগরের হাওয়া শরীরের ক্লান্তির কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। পেছনে ফেলে এসেছি প্রায় পাঁচ মাইল পথ।
ছেঁড়া দীপে নীল সমুদ্রে আশ্রয় নেয়ার পথে সাইকেল নিয়ে সঙ্গীদের অনেকেই দলছুট হয়ে চলে এসেছে। আমার কাছে ছিলো মমিন ভাইয়ের ফোন ও মানিব্যাগ। দেখা হলো তাদের সঙ্গে। এতো বেশি ক্লান্ত যে, তারা কথাই বলতে পারছেন না। মানিব্যাগ থেকে ৫০০ টাকা নামিয়ে নিলেন মমিনভাই। হয়তো সকলে মিলে ডাবসহ হালকা নাস্তা করবে।  
সঙ্গীদের পুরো শরীরে ব্যাথা। নাসির মামার সঙ্গে আবারো মোটর সাইকেলে ছেঁড়া দীপ ঘুরলাম। সৈকতের কয়েকমাইল পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে এলাম হোটেলের কাছে। সৈকতের ধারেই বসে পড়লাম। পরে হোটেলে ফিরে যার যার লাগেজ গোছাতে হলো। প্রিয় দারুচিনির দ্বীপকে বিদায় জানানোর সময় হয়েছে। দুপুরের খাবার খেয়ে ফিরতি জাহাজের যাত্রী আমরা।


 সঠিক সময়ে জাহাজ ছাড়লো। পেছনে ছোট হতে থাকলো প্রিয় ভূখণ্ড। যখন নাফ নদীতে তখন পড়ন্ত বিকেল। পূর্বের মতোই সীগালগুলো আমাদের সঙ্গী। রক্তিম সূর্য এবং উড়ন্ত সীগাল। শেষবারের মতো মুগ্ধ হলাম। কিছু ছবি তুলতে ভুল হলো না। সময় মতো এবং নিরবে পৌঁছালাম টেকনাফ। তারপর সবার আবদারে সোজা কক্সবাজার সৈকতের দিকে। বাস কক্সবাজারে থামিয়ে একটি হোটেলে রাতের খাবার শেষ করে অল্প সময়ের জন্য আমি আর আলাউদ্দিন ভাই মিলে সৈকতে ঘোরাঘুরি ও কেনাকাটা করলাম। এদিকে রাত গভীর হয়ে আসছে। সকালে পৌঁছতে হবে ঢাকায়। অবশেষে ফিরলাম ঢাকার নীড়ে।

প্রজন্মনিউজ২৪/আঃমান্নান

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন





ব্রেকিং নিউজ