শ্রোতার প্রথম পাঠ ।। শ্রুতি ও রাগরূপ

প্রকাশিত: ২৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০৪:৫৮:১৬ || পরিবর্তিত: ২৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০৪:৫৮:১৬

শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা বৈদিক যুগ থেকে হয়ে আসলেও ওস্তাদ-শিক্ষার্থী বা সমঝদার যারা তাদের মধ্যেই এর রস সীমাবদ্ধ। রাগ-রাগিণী সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান না থাকায় শাস্ত্রীয় সংগীতের রস সাধারণের অগোচরেই থেকে গেছে—এমন একটি সাধারণ কথা আমরা শুনি চারপাশে। লেখক বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় ‘শ্রুতি ও রাগরূপ’ শুরু করেছেন এই বক্তব্যকে বাতিল করে দিয়েই। তিনি মনে করেন না যে, শাস্ত্রীয় সংগীতের রস আস্বাদনের জন্য সবাইকে সংগীতশাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে।

“খুব অবাক হয়ে যাই, যখন লোকে বলে, ‘বুঝি না বলেই শাস্ত্রীয় সংগীত শুনতে ভালো লাগে না!’ অথচ ‘বুঝি না বলে রসগোল্লা খাই না’, একথা কদাচ কেউ বলে মনে তো পড়ে না। কিংবা এই যে গোলাপ এত ভালো লাগে, এ কি গোলাপ বুঝি বলেই? যে এস্টার জাতীয় রাসায়নিক যৌগের কারণে গোলাপের সৌরভ, তার রাসায়নিক গঠন বুঝি বলেই কি, তা আমাদের ভালো লাগে?”

লেখকের এই কথার ভেতর শ্রোতাকে সান্ত্বনাবাক্য শোনানোর প্রয়াস থাকলেও তিনি মনে করেন শাস্ত্রীয় সংগীতকে আস্বাদনের চেষ্টা না করে বুঝতে চাওয়াতেই এর সঙ্কট। আমরা আমাদের চারপাশের জগত সম্পর্কে না জেনেও তার সঙ্গে লীন হয়ে আছি, কিন্তু শাস্ত্রীয় সংগীত বুঝতে চাই কোনো রকম সংগীত শিক্ষা ছাড়াই। তিনি অবশ্য দাবী করেন যে, “আমরা আসলে প্রায় সবাই শাস্ত্রীয় সংগীতে মুগ্ধ হয়েই আছি, কারণ আমরা সংগীতের মুগ্ধ শ্রোতা।”

তার এই দাবীর পেছনের কথা হলো, বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় এই বইটি রচনা করেছেন শ্রোতাদের জন্যই। তিনি নানান জাতের গানের উদ্ধৃতি দিয়ে—যার মধ্যে জনপ্রিয় সিনেমার গানও আছে—দেখিয়েছেন যে, শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি জনগণের মুগ্ধতা না থাকলে সেসব গানের জনপ্রিয়তা লাভ করা সম্ভব ছিল না। তখন নিশ্চয়ই সেসব গানের রাগ-রাগিণী সবাই বুঝতে চাননি।

বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় একাধারে কবি, বিজ্ঞান লেখক এবং দীর্ঘ ১৭ বছর কলকাতার আকাশবাণীতে শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেছেন। শ্রোতাদের প্রশ্ন এবং আস্বাদনের আকাঙ্ক্ষার নানা অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি 'শ্রুতি ও রাগরূপ'-কে গড়ে তুলেছেন শ্রোতার বই হিসেবে। এককথায় বলা যায় বইটি শাস্ত্রীয় সংগীতের মর্মমূলে পৌঁছানোর আঁতুড়ঘর।

তিনি ভূমিকায় বলেছেন—“এই বিষণ্ন সময়ে সঙ্গীতের যে চর্চা চলছে, তার আনন্দের ভাগ মূলত শিল্পীদেরই, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের অধিকার তাতে প্রায় নেই বললেই চলে। এর কারণ মূলত দুটি। প্রথমত মানুষের ধারণা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত একটি অতি দুর্বোধ্য বিষয় এবং দ্বিতীয়ত বোধ্য নয় বলেই তা সাধারণের কাছে উপভোগ্যও নয়। কিন্তু এ ভয় অমূলক। কারণ সঙ্গীতের রসাস্বাদন করা যায়। তারও পথ আছে এবং সে পথ সহজ। শুধু এই কথাটা বলার জন্যই এই বইটির প্রকাশ।”

বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়ের অসম্ভব গদ্য ও উপস্থাপনের কলা পাঠককে সাহিত্যের রস আস্বাদন থেকেও বঞ্চিত করবে না এটা নিশ্চিত। তিনি মনে করেন, সঙ্গীতের দৈন্য যদি থেকে থাকে তা শিল্পীর অভাবে নয়, প্রকৃত শ্রোতার অভাবে। ‘শ্রুতি ও রাগরূপ’ সেই শ্রোতা তৈরি করে সঙ্গীতের দৈন্য ঘুচাক সেটাই আমাদের কামনা।

প্রজন্মনিউজ২৪/ মামুন

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন