ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো আগমন ঘটলো যেভাবে

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১২:৩৮:৩৮

এক সময় ঢাকায় ফুটবল লিগের দাপুটে দল ছিল ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ও ওয়ান্ডারার্স ক্লাব। স্বাধীনতার পর আবাহনী-মোহামেডানের দ্বৈরথের মধ্যেও অনেক দিন উজ্জ্বল ছিল আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্র, মেরিনার্স, দিলকুশা এবং ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো ক্লাবগুলো। ফুটবলের পাশাপাশি অনেক ক্লাবেরই ক্রিকেট ও হকি দলও ছিল, যেখানে বিশ্বের নামিদামি অনেক খেলোয়াড় খেলে গেছেন। কারো কারো শিরোপা জয়ের রেকর্ডও রয়েছে। সময়ের আবর্তে ফুটবলের সেই জৌলুস এখন আর নেই। এমনকি ক্রিকেট ভালো করলেও এসব দলগুলোর অনেকেই এখন আর তাতে নেই।

এখন আলোর বদলে অন্ধকারে হাঁটছে মতিঝিল পাড়া বা আশপাশের ক্লাবগুলো। একসময় ক্লাবে হাউজি, ওয়ানটেন হতো। এখান থেকেই ক্লাবের বড় আয়ও আসত। হাউজি ছাড়িয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে অধিকাংশ ক্লাবে ক্যাসিনোও খোলা হয়েছে। যা বাংলাদেশে পুরোপুরি অবৈধ। দেরিতে হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো বন্ধের অভিযানে নেমেছে।

ক্রীড়াপ্রেমীদের মুখে মুখে ঘুরপাক খাচ্ছে, ক্লাবগুলো কিভাবে ক্যাসিনোতে পরিণত হলো?

মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় কয়েকজন ক্রীড়া সংগঠকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্লাবগুলোয় জুয়ার প্রচলন বরাবরই ছিল। জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে হাউজি খেলা হতো। ওই টাকায় ক্লাবের দৈনন্দিন খরচ চলত। জুয়াটা রমরমা হয়ে উঠতে শুরু করে নব্বইয়ের দশক থেকে। ক্লাবগুলো তখন মাত্র মতিঝিল এলাকায় এসেছে। খেলাধুলার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনুদানের টাকায় ক্লাবগুলো আর চলতে পারছিল না। তখনই একটি দুষ্ট চক্র ক্লাবে ঢুকে পড়ে। তারা ক্লাবের ঘর ভাড়া নিয়ে ওয়ানটেন (ছোট তির ছুড়ে মারার খেলা) ও রামি (তাসের খেলা) নামের

খেলা চালু করে। প্রতি রাতে ক্লাবগুলোকে এরা ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিত। যারা জুয়ার আসর বসাত, তারা রাজনৈতিক নেতা, মহল্লার মাস্তান ও পুলিশকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিত। তখন ক্লাবের সংগঠকরা রাজনীতিতে খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না বরং ক্লাবগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল, ফলে খেলাধুলাতেও ক্লাবগুলো বেশ ভালো করেছিল।

তখন মূলত ওয়ানটেন নামে একটি জুয়া হতো। যেটি হাউজি নামেও পরিচিত ছিল। সপ্তাহে কয়েক দিন হতো। ক্লাবের বার্ষিক দাতাদের বাইরে বড় আয় আসত এই হাউজি থেকেই। জুয়া হিসেবে তখন ক্লাবগুলোতে হাউজি, ওয়ানটেন ও রামিসহ কিছু খেলা চালু ছিল আর বোর্ড বা জায়গা ভাড়া দিয়ে অর্থ আয় হতো ক্লাবের। ১৯৯৪ সালের দিকে মতিঝিলের আরামবাগে আগমন ঘটে ওয়ানটেন খেলার। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার প্রায় সব ক্লাবেই। এ নিয়ে জুয়াড়িদের মধ্যে এতটাই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, একে অন্যকে হত্যা করার মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হতেও কুণ্ঠাবোধ করতেন না তারা।

১৯৯৭ সালে দিলকুশা ক্লাবে জুয়াড়িদের হাতে খোকন নামের এক ব্যক্তি মারা যান। এর রেশ ধরে বেশ কয়েক বছর বন্ধ ছিল বেআইনি জুয়া ওয়ানটেন। সেই ওয়ানটেন এখন মৃত। আরামবাগের প্রায় সব ক্লাবেই বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক ক্যাসিনো। দিনে-রাতে সমানে চলত ক্যাসিনো। কোটি কোটি টাকা হাতবদল হয় প্রতিদিন। এই টাকার ভাগ রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে আইশৃঙ্খলা বাহিনী, সাংবাদিকসহ অনেকের পকেটেই যাচ্ছে।

কেউ কেউ বলেন, ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে ক্যাসিনো সংস্কৃতির সূচনা হয়েছে কলাবাগান ক্লাবের হাত ধরে প্রায় ৭-৮ বছর আগে। কলাবাগানে স্লট মেশিন জুয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মানের বোর্ড, নেপাল থেকে প্রশিক্ষিত নারী-পুরুষদের নিয়ে আসা হয়।

এরপরই স্লট মেশিন, জুয়ার আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ বোর্ড এগুলো আসতে শুরু করে ক্লাবগুলোতে। প্রথমে সব ক্লাবই বাকারা নামে একটি খেলা দিয়ে শুরু করে। পরে যোগ হয় রুলেট নামে আরেকটি খেলা।

রবিবার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ এবং দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাবে একযোগে অভিযান চালায় পুলিশ। এসব ক্লাব থেকে ক্যাসিনো মেশিন, জুয়ার বোর্ড, বিদেশি মদ, সিসা বারের সরঞ্জাম, নগদ টাকা ছাড়াও জুয়ার নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে তারা। সাবেক তারকা ফুটবলার শেখ মো. আসলামের ক্যারিয়ারটা শুরু হয়েছিল ভিক্টোরিয়া থেকেই। তিনি বলেন, এসব নামি-দামি ক্লাব কেন অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে তা বুঝতে পারলাম না। হাউজি চলে কিন্তু ক্যাসিনো কোনোভাবেই মানা যায় না। আমি বলব শুধু রাজনৈতিক নেতা নয়, ক্লাব কর্মকর্তাদেরও রিমান্ডে নেয়া উচিত। এর সঙ্গে তারাও জড়িত।

ফুটবল খেলোয়াড় ও ক্লাব সূত্র জানায়, কলাবাগান ক্লাবের আদলে প্রথমে ভিক্টোরিয়া ও পরে একে একে ওয়ান্ডারার্স, ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা, মোহামেডান, আরামবাগে স্লট মেশিন বসে। আগে হাউজির জন্য যেখানে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঘর ভাড়া পেত ক্লাবগুলো, সেখানে প্রতি রাতে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছে। তাই খেলার বদলে জুয়া মুখ্য হয়ে উঠে। আর এভাবে ক্লাবগুলো ক্যাসিনোতে পরিণত হয়।

প্রজন্মনিউজ২৪/রেজাউল

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ