কমিশনের টাকায় বিপুল অস্ত্র ঢুকেছে ক্যাম্পাসে

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১১:৪৭:৩৪

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটি টাকার কেলেঙ্কার নিয়ে উত্তপ্ত ক্যাম্পাস। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং ছাত্রলীগ নেতাদের স্বীকারোক্তিতে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দুর্নীতি বা ‘ঈদ সেলামি’র টাকা পাওয়া না পাওয়ার বিষয় ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে মুখোমুখি অবস্থান করছে শাখা ছাত্রলীগের দুইটি গ্রুপ।

এছাড়া ছেলেদের হলগুলোতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ঢুকেছে। ফলে যে কোন মুহূর্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কাও করছেন ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্টরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রক্টর। ছাত্রলীগের একটি সূত্রে জানা যায়, রেববার ও সোমবার ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানি ও শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন এর ফোনালাপ ফাঁসের পর থেকেই ক্যাম্পাসে অস্ত্র আসতে শুরু করেছে।

সর্বশেষ সোমবার রাতে ভাসানী হলে একটি ‘নাইন এমএম’ ও ২২ রাউন্ড গুলি ঢুকেছে। এছাড়া শাখা ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা একই রাতে ক্যাম্পাসে এসে দুটি পিস্তল রেখে গেছে। অপর একটি তথ্য বলছে ক্যাম্পাসে আ ফ ম কামালউদ্দিন হলে ৪টি, শহীদ সালাম বরকত হলে ৪টি, শহীদ রফিক-জব্বার হলে ৩টি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে ২টি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে অন্তত ১৩টি, মীর মশাররফ হোসেন হলে ১টি এবং আল বেরুনী হলে ১টি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে।

এই অস্ত্রগুলো অধিকাংশ সময় ক্যাম্পাসের বাহিরে রাখা হতো। এছাড়া হলগুলোতে মজুদ করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র। যার মধ্যে রয়েছে- ক্রিচ, রামদা, ছুরি, হকিস্টিক, রড, পাইপ ইত্যাদি। শাখা ছাত্রলীগের এক সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘আগামী ২২ তারিখ থেকে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে। ভর্তি পরীক্ষা শুরুর দু’এক দিনের মধ্যেই সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে বিভিন্ন খাবারের স্টল ( দোকান) বরাদ্দের চাঁদা ভাগাভাগি নিয়ে এ সংঘর্ষ বাঁধতে পারে।’ এই বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা বলেন, ‘একটি পক্ষ ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার পায়তারা চালাচ্ছে। তারা চাচ্ছে আমরা তাদের সাথে সংঘর্ষ বাঁধাই। কিন্তু আমরা তাদের মতলব বুঝতে পেরে সর্বোচ্চ সতর্ক অস্থানে রয়েছি।’

তিনি আরো বলেন, যারা ক্যাম্পাস নিয়ে চক্রান্ত করে তাদের পরিনাম ভাল হয়না। ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, আমরাও এমনটি শুনেছি। ইতিমধ্যে সে অনুযায়ী উর্ধ্বতন প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। ভর্তি পরীক্ষাকে সামনে রেখে ক্যাম্পাসে যদি কেউ অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায় তবে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করবো।’

এদিকে ছাত্রলীগকে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কমিশন দেয়ার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে শিক্ষকদের একাংশের সংগঠন ‘শিক্ষক মঞ্চ’। এ ঘটনার দ্রুত তদন্ত শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তারা। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সাময়িকভাবে ভিসির অব্যাহতিও চেয়েছেন শিক্ষক নেতারা। গতকাল মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষক মঞ্চের পর্যবেক্ষণ ও দাবি সংক্রান্ত এক বিবৃতিতে এসব কথা জানানো হয়।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতির যে ন্যাক্কারজনক ঘটনার অভিযোগ পত্রিকায় উঠে এসেছে, তাতে আমরা মর্মাহত এবং লজ্জিত। উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে প্রশাসনের রহস্যজনক লুকোচুরি এবং একগুঁয়েমির মধ্য দিয়ে ঘটনার শুরু হলেও, পরবর্তিতে টেন্ডার গ্রহণে অনিয়ম এবং ছিনতাইয়ের অভিযোগ সামনে আসে।

এছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এসেছে। ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ভাগ করে দেয়ার অভিযোগ এসেছে। যা একাধিক ছাত্রলীগ নেতা স্বীকারও করেছেন।’ বিবৃতিতে শিক্ষকরা চারটি দাবি তুলে ধরেন।

দাবিগুলো হলো: তদন্ত কমিটি স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে টার্মস অফ রেফারেন্স এবং এখতিয়ার জনসমক্ষে প্রকাশ করা, তদন্তের স্বার্থে উপাচার্যকে সাময়িকভাবে পদ থেকে সরে যেতে হবে, অভিযোগে যাদের নাম এসেছে তাদেরকে তদন্তের আওতায় আনতে হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের এক মানববন্ধনে জাবি ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। অনুষ্ঠানে দ্রæত তদন্ত কমিটি গঠন ও পদত্যাগের দাবি করেন মঞ্চের নেতারা। অপরদিকে আজ বুধবার ভিসির সাথে আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনায় বসার কথা রয়েছে।

সেখানে ভিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত বিষয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আশিকুর রহমান। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা দাবি করবো তদন্তকালীন সময়ে ভিসি যেন তার পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি নেয়। এটা সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সহায়ক হবে।’

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন