কেন মেধাবীরা সাংবাদিকতায় আসতে চায় না?

প্রকাশিত: ৩১ অগাস্ট, ২০১৯ ০৪:২১:১১

সিলেটের একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে মত বিনিময়কালে গত বুধবার দেশের বহুল প্রচারিত শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলেছেন, বর্তমানে ভালো মেধাবীরা সাংবাদিকতায় আসতে চায় না। দেশের শীর্ষ স্থানীয় দৈনিকের মেধাবী সম্পাদকের এ বক্তব্যে অবশ্যই গভীর তাৎপর্য ও সত্য নিহত। তার কথাটি মিথ্যা নয়। কারণ দেখা গেছে, প্রতি বছর যে সব শিক্ষার্থী এস.এস.সি এবং এইচ.এস.সি সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে তাদেরকে তাদের ফিউচার প্ল্যান অর্থাৎ ভবিষ্যতে সে কী হতে চায়, এমন প্রশ্নের জবাবে কিংবা নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সর্ম্পকে বলতে গিয়ে তারা কখনো সাংবাদিক হতে চায় এমনটি প্রায় শোনাই যায় না।

কোন সাংবাদিকের ছেলে বা মেয়েকেও ‘আমি বড়ো হয়ে সাংবাদিক হবো’ এমন কথা বলতে সাধারণত: শোনা যায় না। এক্ষেত্রে সম্পাদক মতিউর রহমান আরেকটি কথা বলেছেন। সেটা হচ্ছে, তরুণ যুবারা সরকারী চাকুরীতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আমরা তার কথার সাথে একমত। তবে এক্ষেত্রে আরো দু’একটি কথা যোগ করতে চাই। বর্তমানে বাংলাদেশের সাংবাদিকিরা যে ধারায় সাংবাদিকতা করছেন, এতে তাদেরকে ‘একান্ত অনুগত বাধ্য ছাত্রে’র সাথে তুলনা করা যায়। তবে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার এসব অনুগত বাধ্য ছাত্রেরা যে মাঝে মাঝে অবাধ্য হচ্ছে না কিংবা একেবারেই দুষ্টুমী করছে না-এমন নয়।

কিন্তু দুষ্টুমী ও অবাধ্যতার সীমা ছাড়িয়ে গেলে এক ধমকে কিংবা ডান্ডা মেরে তাকে ঠান্ডা করে দেয়া হচ্ছে। এদেশের জবরদস্ত কলাম লেখক শফিক রেহমান ও ফরহাদ মাজহারের কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে। ছোটখাটো সাংবাদিকেরা তো সম্পাদক-বার্তা সম্পাদকদের একান্ত অনুগত। তাদের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করার কোন সাহস ও ক্ষমতা তাদের নেই বললেই চলে। সাগর-রুনীর নির্মম পরিণতির কথা নিশ্চয়ই এদেশের সাংবাদিকেরা ভুলে যাননি। সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতাকে কীভাবে জবাই করে হত্যা করা হয়, এর কালজয়ী নজীর হয়ে আছে তাদের আত্মোৎসর্গ।

নয়া দিগন্ত, আমার দেশ, ইসলামী টিভিসহ আরো বহু টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রের বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ এদেশের সাধারন পাঠকদেরও অজানা নয়। দেশের সাংবাদিকতার অবস্থা যখন এমন তখন কোন্ মেধাবী তরুণ বা তরুণী সাংবাদিকতার জগতে পা দিতে চাইবে কিংবা কোন্ অভিভাবক তার সন্তান বা পোষ্যকে এটাকে পেশা হিসেবে নিতে উৎসাহিত করবে? না, কোন ছেলে মেয়ে কিংবা অভিভাবক তা চাইবে না। এটাই স্বাভাবিক।

মেধাবী শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে এই জ্ঞান অর্জন করে যে, বাক স্বাধীনতা তথা মত প্রকাশের স্বাধীনতা একজন মানুষের জন্মগত অধিকার এবং বিভিন্ন সভ্য দেশের সরকার মানুষের এই অধিকার রক্ষা ও নিশ্চিত করতে বাধ্য এবং বদ্ধপরিকর। কিন্তু যে দেশে বরগুনার মিন্নি’র মতো মামলার একজন সাক্ষী বা আসামীকে জামিন দেয়ার সময় এই বলে শর্ত বেঁধে দেয়া হয় যে, সে সাংবাদিকদের সাথে আলাপ করতে পারবে না, করলে তার জামিন বাতিল হয়ে যাবে তখন সেই মেধাবীটির মনে শুধু বিস্ময়ই জাগে না, ক্ষোভও সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় কী সে বিচার বিভাগসহ এদেশের বিভিন্ন বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করবে? না, করবে না।

দেশ পরিচালনার তিন বিভাগের মধ্যে প্রশাসন ও আইন বিভাগতো আগেই গেছে, এখন শেষ ভরসাস্থল বিচার বিভাগও রসাতলে যাওয়ার পথে। সব ক’টি এখন ক্যাঙারু আদালতে পরিণত হতে চলেছে। অথচ এই আদালত যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের প্রেসিডেন্টের যে কোন আদেশকে মুহূর্তেই অকার্যকর করে দিতে পারে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকেও যে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে এমন নজীর রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে অন্যান্য বিভাগ দূরে থাক্ এই বিচার বিভাগও সাংবাদিকদের সাথে সব সময় ন্যায় বিচার করতে দেখা যাচ্ছে না। বরং ক্ষমতাসীনদের হুকুমবর্দার হয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

কয়েক শতাব্দি আগে, ইংরেজ মহাকবি জন মিল্টন, তার ‘অ্যারিওপ্যাজেটিকা’ নামক বিখ্যাত প্রবন্ধে স্বাধীন মত প্রকাশের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন। মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনেকেই তা পাঠ করে। কিন্তু বাস্তবের সাথে যখন তারা তাদের এই শিক্ষার মিল খুঁজে পায় না, তখন হতাশ হয়। বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার প্রতি। দলীয় বিবেচনায় দলের লোকজনকে টিভি চ্যানেলের মালিক বানিয়ে এবং ভিন্নপন্থী ও অন্যান্য চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দলীয় কীর্তন উৎসবও এসব মেধাবীদের সৃষ্টি এড়িয়ে যাবার কথা নয়। তাই এতো সব জেনে শুনে ও বুঝে তারা এই মহতী পেশাকে কালিমালিপ্ত করার সাথে সাথে নিজেদের সৎ সাংবাদিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে হত্যা করতে যে এমুখো হতে চাইবে না, এটাই স্বাভাবিক। শুধু সরকারী চাকুরীর সুযোগ-সুবিধার প্রলোভনই যে তাদেরকে এই মহতী পেশা থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে, তা ভাবলে নিশ্চিতভাবেই ভুল হবে।

প্রজন্মনিউজ২৪/নাবিল

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন