‘ডি’ বক্সে ঢুকে পড়েছে বিসিবি

প্রকাশিত: ১৫ অগাস্ট, ২০১৯ ০২:৫৩:২১

কে হবেন নতুন কোচ? উত্তরটা এখনই জানা যাবে না জেনেও এই প্রশ্ন সবার মুখে। স্টিভ রোডসের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া ব্যাটন বিসিবি তুলে দিতে যাচ্ছে কার হাতে? এসব ক্ষেত্রে বিসিবির একটা কৌশল হলো, বাতাসে অনেক নাম ছেড়ে দেওয়া। সংবাদমাধ্যম সেসব নাম নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে। এর মধ্যে আসলেই তারা যাঁকে কোচ করতে চায়, তাঁকে নিয়ে বিসিবি ঢুকে পড়বে ‘ডি’ বক্সের ভেতর।

এরপর চূড়ান্ত শটটা ঠিকভাবে নিতে পারলেই গোল। রোডসের উত্তরসূরি খোঁজার ক্ষেত্রেও বিসিবি এখন ‘ডি’ বক্সের ভেতর ঢুকে পড়েছে। যেকোনো সময় সভাপতি নাজমুল হাসানের জোরালো শটে গোল হয়ে যাবে, এ রকম একটা অবস্থা। কিন্তু এবার কি আসল জনের নামটা লুকোতে পারলেন তাঁরা বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ সময়ই বিসিবির চেষ্টাটা শেষ পর্যন্ত বৃথা যায়। কোনো না কোনোভাবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই বের হয়ে যায় কোচের নাম।

স্টুয়ার্ট লর বেলায় তো বিসিবি নাম ঘোষণার আগে প্রথম আলোয় অস্ট্রেলিয়ান কোচের বিশাল সাক্ষাৎকারও ছাপা হয়ে গিয়েছিল! ব্যতিক্রম, সর্বশেষ কোচ স্টিভ রোডস। বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গনে চমক হয়ে এসেছিলেন এই ব্রিটিশ। কিন্তু এবার আবার বিসিবি ‘ডি’ বক্সে ঢোকার আগেই আলোচনায় অন্তত দুটি নাম—রাসেল ডমিঙ্গো ও মাইক হেসন। অনেক লুকোছাপা করেও ডমিঙ্গোর ঢাকায় সাক্ষাৎকার দিতে আসাটাকে আড়াল করতে পারেনি বিসিবি।

কাজেই এই একটা নাম নিশ্চিতভাবেই আছে তাদের তালিকায়। নিউজিল্যান্ডের সাবেক কোচ মাইক হেসনের নামও আছে। কিন্তু তাঁর নাম প্রকাশ্যে বলার মতো পরিস্থিতিতে এখনো পড়তে হয়নি বিসিবিকে। পরিচালকরা ‘অফ দ্য রেকর্ড’ হয়তো বলছেন হেসনকেও তাদের পছন্দ। কিন্তু প্রকাশ্যে ভাবটা এমন, ‘হেসনের নামও আছে নাকি!’ সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার আগে কোচদের নাম তাঁদের ভাবমূর্তির কথা মাথায় রেখেই গোপন রাখার চেষ্টা করে বিসিবি।

হেসনের ব্যাপারটাই ধরুন। ভারতের সম্ভাব্য কোচদের সংক্ষিপ্ত তালিকায়ও তিনি আছেন। এখন যদি বিসিবি এটা আনুষ্ঠানিকভাবে বলে দেয় যে হেসন তাদেরও সংক্ষিপ্ত তালিকায় আছেন এবং দুদিন পর তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে প্রধান কোচের চাকরি দিয়ে দেয়, তখন বেচারা হেসনের অবস্থাটা কী হবে ভাবুন! বিসিসিআই বলবে, ‘তোমার তো ভাই বাংলাদেশেই চাকরি হয় না, আমাদের এখানে কী করবে!’ কোচদের বাজারে তাঁর দামটাও যাবে কমে।

আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার আগে সংবাদমাধ্যমে নাম এসে যাওয়ায় অতীতে অনেক বিদেশি কোচই বিসিবির ওপর বিরক্ত হয়েছেন। সে কারণেই বাজারে ভুয়া নাম ছেড়ে দেওয়ার ‘প্রকল্প’। পল ফারব্রেস, গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার যেমন। মাঝে কোচ নিয়ে পরিচালকদের এক সভা শেষে দু-একজন বোর্ড পরিচালক পরিকল্পনা করেই চন্ডিকা হাথুরুসিংহের নাম ছেড়ে দিয়েছিলেন সংবাদমাধ্যমে। আদতে শ্রীলঙ্কান এই কোচের ওপর খোদ বিসিবি ‘বস’ নাজমুল হাসানই চরম বিরক্ত।

বাংলাদেশের দায়িত্ব ছেড়ে যাওয়ার পরও একের পর এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন হাথুরুসিংহে। বাংলাদেশ দলের নতুন কোচ কে হবেন, সেটি এখনো চূড়ান্ত না হলেও হাথুরুসিংহে যে হচ্ছেন না, সেটি নিশ্চিত করেছেন বিসিবিরই একাধিক কর্মকর্তা। শুধু বিসিবি কেন, শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির কারণে বিশ্বের অন্যান্য বোর্ডও নাকি তার ব্যাপারে এখন নেতিবাচক ধারণা পোষণ করছে।

বিসিবির এত গোপনীয়তার পরও ঘুরেফিরে প্রশ্নটা থাকছেই—বাংলাদেশ দলের পরবর্তী প্রধান কোচ কে হচ্ছেন? ডমিঙ্গো সাক্ষাৎকার নিয়ে গেছেন। টেলিকনফারেন্সে বিসিবি কাল পর্যন্ত কথা বলেছে আরও তিনজনের সঙ্গে, আজ একইভাবে সাক্ষাৎকার দেওয়ার কথা আরেক কোচের। সব ঠিকঠাক হওয়ার আগ পর্যন্ত বিসিবি কর্মকর্তারা কারও নামই বলতে রাজি নন। তবে কেমন কোচ তাঁরা চান, সেটি বলতে তো আর বাধা নেই!

এখন পর্যন্ত হওয়া টেলিকনফারেন্সগুলো সম্পর্কে যেমন একটা ধারণা দিচ্ছিলেন বিসিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তা, ‘আমরা মূলত দেখছি, বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্পর্কে কার আগ্রহ বেশি। কাজটাকে শুধু চাকরি হিসেবে না নিয়ে কে মন থেকে ভালোবেসে আমাদের ছেলেদের নিয়ে কাজ করবে। বাংলাদেশের ক্রিকেট কার আগ্রহের জায়গায় আছে, আমরা সেটিই গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’ আলোচনার সময় বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে কোচদের পরিকল্পনাও জেনে নিচ্ছেন বিসিবির কর্মকর্তারা।

সেখানে পেশাদারি দৃষ্টির সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে কার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ভালো, সেটিও গুরুত্ব পাচ্ছে বিসিবির কাছে। এসবে মিলে গেলে বিসিবি দেখছে, তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কোন কোচ চুক্তির সময়টায় সার্বক্ষণিক বাংলাদেশ দলকে সময় দিতে পারবেন। আইপিএল, বিগব্যাশে কাজ করার জন্য ‘উইন্ডো’ চাইবেন না, ইত্যাদি। সেটিও মিলে গেলে আসে টাকা-পয়সার প্রসঙ্গ।

বিসিবি সভাপতির সঙ্গে টেলিকনফারেন্সগুলোতে থাকছেন বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন চৌধুরী এবং দু-তিনজন সংশ্লিষ্ট পরিচালক। এখন পর্যন্ত যাঁদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে বিসিবির প্রত্যাশার সঙ্গে বেশি মিলছে দক্ষিণ আফ্রিকান কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর চিন্তাভাবনা। ঈদের আগে ঢাকায় এসে দিয়ে যাওয়া প্রেজেন্টেশনেই নাকি বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতি নিজের ভালোবাসা ও আগ্রহের ছবিটা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন তিনি।

হেসন তাঁর দাবিকৃত মোটা অঙ্কের বেতন থেকে সরে না এলে এবং বিসিসিআই নতুন কোচের নাম ঘোষণায় বিলম্ব করলে হতে পারে ডমিঙ্গোই পেয়ে যাবেন বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব। ডমিঙ্গো এগিয়ে আছেন আরও একটি দিক দিয়ে। তাঁর এজেন্ট যে কাস্তভ লাহিড়ি! বিসিবির অনেক পরিচালকেরই খুব কাছের লোক কলকাতার এই ক্রিকেট এজেন্ট।

আইসিএল-কাণ্ডের পর তাঁর নামটা বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিতর্কিতভাবে এলেও বিপিএলের শুরুতে তিনি টুর্নামেন্টটির সঙ্গে ভালোভাবেই ছিলেন। বিপিএল এবং ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোকে খেলোয়াড় সরবরাহ করা থেকে শুরু করে সর্বশেষ চার্ল ল্যাঙ্গেভেল্টকে পেস বোলিং কোচ করায়ও ভূমিকা আছে লাহিড়ির। ল্যাঙ্গেভেল্টের এজেন্ট তিনি। লাহিড়ি কাজ করেছেন বিসিবির নবনিযুক্ত স্পিন পরামর্শক ডেনিয়েল ভেট্টোরির সঙ্গেও।

তবু শেষ কথাটা এখনই বলা যাচ্ছে না। ‘ডি’ বক্সের ভেতর থেকেও তো গোল মিস হয়!

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ