ইফা ডিজির এত দুর্নীতি

প্রকাশিত: ২০ জুন, ২০১৯ ০৬:২৭:১২

ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি কর্মকাণ্ড এবং দুর্নীতির কারণে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালের ওপর ক্ষেপেছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়করণ, নিয়ম বহির্ভূতভাবে দৈনিক-ভিত্তিতে শত শত কর্মচারী নিয়োগ, অন্যের দ্বারা বই লিখিয়ে লাখ লাখ টাকা গ্রহণ, বিনা কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাহারসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য এখন বেরিয়ে আসছে।

স্বজনপ্রীতি আত্মীয়করণের অভিযোগ

ডিজি হিসেবে যোগদানের পূর্বে তার ভায়েরা-ভাই সৈয়দ শাহ এমরান এখানে সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, গত ১০ বছরে ডিজি তার অসংখ্য আত্মীয়-স্বজনকে অন্যায়, অনিয়ম ও অবৈধভাবে এখানে চাকরি দেন। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন- সহকারী পরিচালক পদে ডিজির আপন বোনের মেয়ে ফাহমিদা বেগম (বর্তমানে কক্সবাজারের উপ-পরিচালক হিসেবে কর্মরত), মহিলা কো-অর্ডিনেটর অফিসার পদে আরেক বোনের মেয়ে সিরাজুম মুনীরা (বর্তমানে দীনী দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের মহিলা শাখায় কর্মরত), সহকারী পরিচালক পদে আপন ভাইয়ের ছেলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি), বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম পদে আপন বোনের ছেলে মাওলানা এহসানুল হক, উৎপাদন ব্যবস্থাপক পদে ভাইয়ের ছেলে মো. শাহ আলম (বর্তমানে চট্টগ্রামে সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত), প্রকাশনা কর্মকর্তা পদে আরেক ভাইয়ের ছেলে মো. রেজোয়ানুল হক (বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ছাপাখানায় উৎপাদন ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত), হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে আরেক ভাইয়ের ছেলে মো. মিসবাহ উদ্দিন (৫৬০ মডেল মসজিদ প্রকল্পে কর্মরত), আর্টিস্ট পদে শ্যালিকা ফারজিমা মিজান শরমীন (বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ছাপাখানায় কর্মরত), সহকারী পরিচালক পদে ভায়েরার ছেলে মো. মোস্তাফিজুর রহমান (বর্তমানে প্রশাসন বিভাগে কর্মরত), সহকারী পরিচালক পদে বন্ধুর মেয়ে সৈয়দ সাবিহা ইসলাম (বর্তমানে প্রশাসন বিভাগে কর্মরত), সহকারী পরিচালক পদে আরেক আত্মীয় আবদুল্লাহ আল মামুন (বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ছাপাখানায় উৎপাদন ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত), সহকারী পরিচালক পদে আরেক আত্মীয় ইলিয়াস পারভেজ (মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পে কর্মরত), ডিজির ছেলে অনিকের গৃহশিক্ষক আতিয়ার রহমানকে প্রোগ্রাম অফিসার পদে (ইসলামিক মিশন প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত) নিয়োগ প্রদান করেন। এগুলো সবই প্রথম শ্রেণির পদ।

এছাড়া ভাইয়ের ছেলে মো. রাসেল মিয়াকে ইসলামিক মিশনের ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান পদে, আপন ভাইয়ের ছেলে মুনিমকে এলডিএ পদে, মাহমুদকে এলডিএ পদে, মাহমুদের স্ত্রীকে ল্যাব-টেক পদে, রতনকে ফিল্ড সুপারভাইজার পদে, ফয়সালকে হিসাবরক্ষক পদে, আনোয়ারুল আজিমকে উচ্চমান সহকারী এবং আনোয়ারুল হককে গবেষণা সহকারী পদে নিয়োগ দেয়। এসব নিয়োগে কোনো নিয়মনীতি কিংবা মেধা ও যোগ্যতা বিবেচনা করা হয়নি।

এছাড়া ডিজির ঘনিষ্ঠ পরিচালক মু. হারুনুর রশিদের (ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা) ছেলে নাজমুস সাকিবকে সহকারী লাইব্রেরিয়ান পদে (বর্তমানে কুমিল্লা জেলায় সহকারী পরিচালক পদে), ডিজির ঘনিষ্ঠ পরিচালক তাহের হোসেনের স্ত্রীর বোনের মেয়ে সাহিনা আক্তারকে সহকারী পরিচালক পদে (বর্তমানে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ে কর্মরত), পীরভাই জালাল আহমদের স্ত্রী মাহমুদা বেগমকে প্রোগ্রাম অফিসার পদে (কেন্দ্রীয় অর্থ ও হিসাব বিভাগে সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত), ডিজির ঘনিষ্ঠ পরিচালক এ বি এম শফিকুল ইসলামের আত্মীয় হোমায়রা আক্তারকে পরিকল্পনা কর্মকর্তা পদে (পরিকল্পনা বিভাগে কর্মরত) নিয়োগ দেন।

আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের নিয়োগ দিতে তিনি কোনো বিধি-বিধানের ধার ধারেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চরম জালিয়াতিরও আশ্রয় নেন। যেমন- আর্টিস্ট পদে কর্মরত ডিজির শ্যালিকা ফারজিমা মিজান শরমিনের চাকরির আবেদনেরই কোনো যোগ্যতা ছিল না। ওই পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয়েছিল যেকোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় স্নাতকোত্তর। অথচ তার চারুকলার কোনো ডিগ্রি নাই। হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে কর্মরত ডিজির ভাতিজা মো. মিসবাহ উদ্দিনের জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়, অথচ তাকে ঢাকা জেলার কোটায় চাকরি দেয়া হয়েছে।

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম পদে কর্মরত ডিজির ভাগ্নে মাওলানা এহসানুল হকের চাকরি লাভের প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নাই। এ বিষয়ে হাইকোর্টেও মামলা হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ছাপাখানায় উৎপাদন ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ডিজির ভাতিজা মো. রেজোয়ানুল হককে প্রকাশনা কর্মকর্তা পদে অবৈধভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ওই পদে যোগ্যপ্রার্থী মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নাসির উদ্দিন শেখকে বাদ দিয়ে নম্বর বাড়িয়ে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

সহকারী পরিচালক পদে কর্মরত ডিজির ভাগনী ফাহমিদা বেগম লিখিত পরীক্ষায় ৬০ নম্বরের মধ্যে পান ৩০। কিন্তু ২৮ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষায় তিনি পান ২৭ নম্বর। ডিজি মামার কারণে ফাহমিদা বেগম ২০১০ সালের জুন মাসে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ‘সহকারী সম্পাদক’ পদে চাকরি পান। তিনি যে পদে নিয়োগ পান তা সৃজিত কোনো পদ নয়। মনগড়া ও পারস্পরিক যোগসাজশে তাকে চাকরি দেয়া হয়েছে।

ডিজির ভাতিজা মো. শাহ আলমকে ‘উৎপাদন ব্যবস্থাপক’ পদে চাকরি দেয়া হয়েছে। অথচ ইতোপূর্বে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রেসে ‘কম্পিউটার অপারেটর’ পদে দৈনিক ভিত্তিতে চাকরি করেছেন। উৎপাদন ব্যবস্থাপক পদে বয়সসীমা চাওয়া হয় ৩০ বছর। কিন্তু এসএসসির সনদ অনুযায়ী শাহ আলমের বয়স তার চেয়ে বেশি। তার শিক্ষার সনদে ঘষামাজার চিহ্ন পাওয়া যায়।

নিয়ম বহির্ভূতভাবে দৈনিক-ভিত্তিতে ৬/৭শ কর্মচারী নিয়োগ

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে দৈনিক-ভিত্তিতে ৬০০-৭০০ জন কর্মচারী নিয়োগ দেন সামীম মোহাম্মদ আফজাল। আর্থিক লেনদেন, স্বজনপ্রীতি, পদ রক্ষা, আত্মীয়করণ ইত্যাদির জন্য তিনি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে দৈনিক-ভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে তাদের নিয়মিতকরণ করা হয়। যদিও দৈনিক-ভিত্তিতে চাকরি দেয়ার কোনো বিধি-বিধান নেই।

প্রদানডিজির পীরকে অবৈধভাবে ১৪ লাখ টাকা

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজাল নারিন্দার মশুরীখোলা দরবারের পীর শাহ মোহাম্মদ আহছানুজ্জামানের মুরিদ। ‘বোগদাদী কায়দা’ নামে একটি আমপারা শাহ মোহাম্মদ আহসানুজ্জামানের নামে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা বিভাগ থেকে ছাপা হয়। ওই বইয়ের রয়্যালিটি বাবদ তাকে ১৪ লাখ টাকা প্রদান করা হয়, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। কারণ বোগদাদী কায়দা সুপ্রাচীন কাল থেকে এ উপমহাদেশে কুরআন শরীফ শেখার জন্য পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত। এটার লেখক শাহ আহসানুজ্জামান নন। অথচ ডিজি তার পীর শাহ আহছানুজ্জামানের নামে লাখ লাখ বোগদাদী কায়দা ছেপে অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

অন্যকে দিয়ে বই লিখিয়ে লাখ লাখ টাকা রয়্যালিটি গ্রহণ

মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের আগে সামীম মোহাম্মদ আফজালের নিজ নামে কোনো বই ছিল না। কিন্তু ইফার ডিজির দায়িত্ব নেয়ার পর তার নামে ২৫টির অধিক বই বের হয়। অভিযোগ রয়েছে, একটি বইও তিনি নিজে লেখেননি।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক পরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও নুরুল ইসলাম মানিক অধিকাংশ বই লিখে দিয়েছেন। অন্যের লেখা বই ডিজি নিজের নামে ছাপিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে লাখ লাখ টাকার রয়্যালিটি গ্রহণ করেছেন।

প্রেসের মেশিন ক্রয়ে সোয়া কোটি টাকা লোপাট

২০১০ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রেসের জন্য এক কোটি ৭৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হলেও মাত্র ৪৫ লাখ টাকায় মেশিন কেনা হয়। এক্ষেত্রে প্রায় সোয়া কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। ফাইলে দেখানো হয়েছে হাইডেলবার্গ জার্মানির মেশিন কিন্তু বাস্তবে কেনা হয়েছে চায়না মেশিন। দুর্নীতির টাকা ডিজিসহ তার ঘনিষ্ঠ পরিচালক হারুনুর রশিদ, তাহের হোসেন, সাহাবউদ্দিন খান ও হালিম হোসেন খান ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।প্রেসকে অবৈধভাবে ৭০ লাখ টাকা প্রদান

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রেস দেশের প্রথম শ্রেণির ছাপাখানাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখান থেকে লাখ লাখ পবিত্র কুরআনুল করীম ছাপানো হয়। কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ছাপাখানার উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও শুধুমাত্র পদ রক্ষার জন্য সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর প্রেস থেকে অবৈধভাবে ৭০ লাখ টাকার কুরআনুল করীম ছাপানো হয়।

ইমামদের সামনে ব্যালে নৃত্য প্রদর্শন

২০১০ সালে এক অনুষ্ঠানে ব্যালে নৃত্য প্রদর্শন করে ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজাল ইসলাম ধর্মের অপমান করেন। এর বিরুদ্ধে দেশের সর্বস্তরের আলেম-ওলামা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তার পদত্যাগও দাবি করা হয়। ওই সময়ে কৌশলে তিনি রক্ষাপান।

বিনা কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাসপেন্ড

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি দায়িত্ব গ্রহণের পর কোনো কারণ ছাড়াই বহু সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাসপেন্ড করা হয়। সর্বশেষ তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ ও মার্কেট বিভাগের পরিচালক এবং বঙ্গবন্ধুপরিষদ ইসলামিক ফাউন্ডেশন শাখার আহ্বায়ক মুহাম্মদ মহীউদ্দিন মজুমদারকে গত ৩ জুন কোনো কারণ ছাড়াই সাসপেন্ড করেন। পরবর্তীতে ধর্ম মন্ত্রণালয় তার এ অবৈধ বহিষ্কারাদেশ বাতিল করে। সেখান থেকে মূলত তার পদত্যাগের দাবিতে মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ সোচ্চার হন। এছাড়া তিনি ফাউন্ডেশনের পরিচালক মো. আফজাল উদ্দিন ও পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ারসহ অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সামান্য অজুহাতে সাসপেন্ড করেন। ফলে ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অবর্ণনীয় দুঃখৎ-কষ্ট নেমে আসে।

১০ পদে নিয়োগে মহাজালিয়াতি!

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ১০টি পদে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। ওই নিয়োগে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জালিয়াতি, দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়। জানা যায়, ২০১০ সালের ২৫ অক্টোবর নিয়োগ ও পদোন্নতি সংক্রান্ত সিলেকশন কমিটির একটা সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং যথারীতি কার্যবিবরণী প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু নিয়োগে প্রক্রিয়ার প্রতিটি পরতে পরতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি থাকায় নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তৎকালীন সচিব ড. আলফাজ হোসেন রেজুলেশনে সই করেননি। অথচ নিয়োগ কমিটির সকল সদস্য রেজুলেশনে সই করেন। দুর্নীতিবাজগণ এ নিয়ে বিপাকে পড়ে যান। পরবর্তীতে ড. আলফাজ হোসেনকে ছুটি দেখিয়ে তার লিভ-সাবস্টিটিউট হিসেবে ফাউন্ডেশনের প্রভাবশালী পরিচালক তাহের হোসেনকে সচিবের দায়িত্ব দিয়ে ২০১৬ সালের ২৬ নভেম্বর সিলেকশন কমিটির আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায়ও একটি রেজুলেশন হয়। সেখানে দেখা যায় যে, একটি নিয়োগের বিপরীতে দুটি রেজুলেশন গৃহীত হয়। যা মহাজালিয়াতি, অনিয়ম ও অন্যায় বলে মন্তব্য করেন ইফার একাধিক কর্মকর্তা।

ওই দুটি রেজুলেশন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকাশনা কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পাওয়া মো. রেযোয়ানুল আলম ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সভার রেজুলেশনে মৌখিক পরীক্ষায় ১২ পান কিন্তু ২৬ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সভার রেজুলেশনের মৌখিক পরীক্ষায় ১৬ নম্বর দেখানো হয়।

আর্টিস্ট পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ফারজীমা মিজান শরমীন প্রথম রেজুলেশনে মৌখিক পরীক্ষায় ১৫ পান কিন্তু পরের সভার রেজুলেশনের মৌখিক পরীক্ষায় ১৭ নম্বর দেখানো হয়। একইভাবে সহকারী লাইব্রেরিয়ান পদে নিয়োগপ্রাপ্ত মো. নাজমুস সাকিব আগে ও পরের সভার রেজুলেশনে মৌখিক পরীক্ষায় ১৮ ও ১১ নম্বর দেখানো হয়।

এভাবে দুটি রেজুলেশনে প্রার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরে ব্যাপক গড়মিল দেখা যায়। নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের নেয়ার জন্য মৌখিক পরীক্ষার নম্বর প্রয়োজন মোতাবেক কম-বেশি করা হয়। এ নিয়োগে সবচেয়ে বড় অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যোগ্যপ্রার্থী থাকার পরও এ কোটা থেকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। এমন এক চাকরিপ্রার্থী নাসির উদ্দিন শেখ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় প্রকাশনা কর্মকর্তা পদে তার নিয়োগ পাওয়ার কথা। কিন্তু তাকে বাদ দিয়ে প্রকাশনা কর্মকর্তা পদে ডিজিরি ভাতিজা রেজোয়ানুল হককে নিয়োগ দেয়া হয়।

আর্টিস্ট পদে চারুকলা থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর কথা নিয়োগবিধিতে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এ পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ফারজীমা মিজান শরমীনের চারুকলার কোনো ডিগ্রি নেই। তিনি কম্পিউটার গ্রাফিক্স-এর ওপর একটি কোর্স করেছেন মাত্র। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালের শ্যালিকা হওয়ায় তাকে এ পদে নিয়োগ দেয়া হয়।

সহকারী লাইব্রেরিয়ান পদে নিয়োগপ্রাপ্ত মো. নাজমুস সাকিব ‘মুক্তিযোদ্ধা’ কোটায় চাকরি পান। তার পিতা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রভাবশালী সাবেক পরিচালক মু. হারুনুর রশিদ। কিন্তু তার মুক্তিযোদ্ধার সনদ ভুয়া। প্রভাবশালী ডিজির সহায়তায় এভাবে বিভিন্ন অনিয়ম করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, ইফা’র ডিজির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও সামীম মোহাম্মদ আফজাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রয়েছে- এমন কথা বলে প্রভাব খাটাতেন। ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে দুদকও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করছে। ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইফা মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি। পরিচয় জানিয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।

তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কর্মরত তার ঘনিষ্টজনদের কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বেকায়দায় পড়লে হাতি, চামচিকায় মারে লাথি’ প্রবাদের মতো অবস্থা হয়েছে এখন। ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সামীম মোহাম্মদ আফজালের সম্পর্কের অবনতির সুযোগ নিয়ে এখন যারা তার দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরছেন তারা কি নিজেরা ধোয়া তুলসী পাতা?

তারা বলেন, বায়তুল মোকাররম মসজিদের পিলার ভাঙার ঘটনায় যে পরিচালককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে তিনি নিজেও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একসময় তিনি ছিলেন ডিজির খুব কাছের লোক। ইফা ডিজির দুর্নীতির তদন্ত হলে বহু কর্মকর্তার নাম আসবে বলেও মন্তব্য করেন তারা।

প্রজন্মনিউজ২৪/নাবিল

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ