শাবানা সন্তানের ঝুঁকি নিয়েও শুটিং করতেন

প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০১৯ ০৪:২৮:১৩

এখনও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরসবুজ হয়ে আছেন চিত্রনায়িকা শাবানা। দীর্ঘদিন চলচ্চিত্র থেকে দূরে থাকলেও এতটুকু কমেনি তার আবেদন, গ্রহণযোগ্যতা। সিনেমার সোনালি দিনের নায়িকা তিনি। তার সময়ে আরও অনেকেই ছিলেন যারা নামে ও গুণে দেশসেরা অভিনেত্রীর আসনে জায়গা করে নিয়েছেন।

তবে তাদের মধ্যে শাবানার আবেদনটা অন্যরকম। তার নাম নিলেই দর্শকের হৃদয় নত হয় শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়। নতুন প্রজন্মের দর্শকেরাও আফসোস করেন নতুন ছবিতে শাবানার অভিনয় থেকে বঞ্চিত হয়ে। পরিচালক-শিল্পীদেরও আক্ষেপ শোনা যায় শাবানাকে ছবিতে না পেয়ে। যুগ যুগ ধরে এই ক্রেজ, এই আবেদন টিকে থাকার রহস্য কী? সেই রহস্যের সূত্রই যেন বলে দিলেন শাবানা অভিনীত সুপারহিট ‘রাঙা ভাবী’, ‘অন্ধ বিশ্বাস’ সিনেমার নির্মাতা ড. মতিন রহমান।

আজ ১৫ জুন শাবানার জন্মদিন। এই দিনে ‘রাঙা ভাবী’ সিনেমার শুটিং চলাকালীন শ্বাসরুদ্ধকর এক গল্পের স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি। পাশাপাশি শাবানার বড় মাপের অভিনেত্রী হয়ে ওঠার গোপন সূত্রটাও জানালেন নিজের মতো করে। ১৯৮৯ সালে মতিন রহমান পরিচালিত ‘রাঙা ভাবী’ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন শাবানা। ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিলো সিনেমাটি। এরপর ১৯৯২ সাথে এই নির্মাতার ‘অন্ধ বিশ্বাস’ ছবিতেও প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন ‘বিউটি কুইন’ শাবানা। বাংলা সিনেমার আর্কাইভে উজ্জ্বল হয়ে আছে সিনেমা দু’টি।

খ্যাতিমান নির্মাতা মতিন রহমান বললেন, ‘শুধু শাবানা নয়, শাবানার সময়ের যেসব শিল্পীরা ছিলো তাদের মন মানসিকতা অনেক ভালো মানের ছিলো। সিনেমাকে নিজেদের জীবনের অংশ হিসেবে ভেবে নেওয়া, এ বিষয়টা খুব স্পষ্ট ছিলো তাদের কাজে। তারা নিজেদের সামাজিক জীবন, পারিবারিক জীবন, সব কিছুকেই যেমন মূল্য দিতেন তেমন সিনেমা শিল্পকে সম্মান ও মূল্যায়ন করতেন, পরিচালকদের মূল্যায়ন করতেন। তারা খুবই প্রফেশনাল ছিলেন, তাদের সময় জ্ঞান ছিলো।

পরিচালক তাদের কাছ থেকে কী ধরণের অভিনয়, কী ধরণের সহযোগীতা কামনা করছে সেভাবে শতভাগ এফোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করতেন। যার কারণে সিনেমাগুলো সুনির্মিত হতো। পরিচালকরা তাদের চিন্তা ভাবনা স্পষ্টভাবে তাদের সিনেমায় রাখতে পারতেন। ছবিগুলো জনপ্রিয় হবার কারণও এটা। দীর্ঘদিন দর্শকদের মনে থাকারও এটা কারণ। এটা ছিলো সেই সময়ের শাবানা কিংবা শাবানার মতো শিল্পীদের চরিত্র। বিশেষ করে জ্ঞান, সরলতা, অধ্যাবসায়, সবাইকে আপন করে নেওয়ার যে গুণ এটা অনেক শিল্পীর মধ্যেই সেই সময় ছিলো। তবে শাবানার মধ্যে বেশি পেয়েছি। তার ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ করতো, অনুপ্রাণিত করতো।’

মতিন রহমান আরও বলেন, ‘শাবানা যখনই সেটে আসতেন, সব শিল্পী-কলাকুশলী থেকে শুরু করে সাধারণ প্রোডাকশন বয়দেরও নিজের পরিবারের লোক মনে করতেন। সবাইকে সেভাবেই ট্রিট করতেন। যার কারণে শাবানাকে সবাই মনে রেখেছে। শাবানাকে সবাই পছন্দ করে। তিনি সিনেমায় এমন একটা অবস্থান ও আদর্শ দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন যে সেটা কিংবদন্তী হয়ে আছে। দেখবেন, আজও শাবানার মতো হতে চায় বাংলার গৃহবধুরা।’

সিনেমাকে কতোটা ভালোবাসতেন শাবানা তা বলতে গিয়ে মতিন রহমান শোনালেন এক গল্প। তিনি বলেন, ‘ঝুঁকি নিয়ে সে কাজ করতো। অভিনয়টাকে সাবলীল করতে চেষ্টার ত্রুটি ছিলো না তার। এখনো মনে পড়ে ‘রাঙা ভাবী’র শুটিংয়ের কথা। শাবানা বেসিক্যালি শিল্পী ছিলেন।,শিল্পীরা কী করে? অনেক সময় তারা তাদের সুখ দুঃখকে জলাঞ্জলি দেয় শিল্পের স্বার্থে। অনেক ত্যাগ করে। ‘রাঙাভাবী’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় তিনি ছিলেন চার মাসের সন্তান সম্ভবা। আমি শুটিং করছিলাম হিমালয়ের পাশে একটা জায়গাতে। গম ক্ষেত ছিলো, সরিষা ক্ষেত ছিলো। শীতের সকাল ছিলো।

শট দিতে দিতে উনি গড়িয়ে পড়ে গেলেন। উনাকে গম ক্ষেতের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ক্যামেরা অফ করে আমরা দৌড়ে গেলাম। তাকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। যেহেতু পাহাড়ের ঢালুতে শুটিং চলছিলো, পা পিছলে পড়ে কোনো গভীর জায়গাতে চলে গেছিলেন। তাই আমাদের খুঁজে পেতেও সময় লাগলো। আমরা তাকে জ্ঞান হারা অবস্থায় পেলাম। সঙ্গে সঙ্গে তাকে নেপাল সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার বললো এই পরিশ্রমটা তার জন্য খুব বিপজ্জনক। তার আসা ঠিক হয়নি। এই সময় নাচ করা, দৌড়ে আসা ঠিক না।

বাংলাদেশের ডাক্তারও এই কথা বলেছিলো। তারপরও এই শিডিউলটা ধরেন তিনি। অনেক শিল্পী একসঙ্গে এসেছিলো এই শুটিংয়ে। দীর্ঘ ২১ দিন শুটিং। পরে এই শুটিং আয়োজন করতে গেলে আমাকে অনেক আয়োজন করতে হতো। প্রায় ১ বছর পরে শুটিং করতে হতো। আমার এই ভোগান্তির কথা ভেবেই নিজের ও নিজের অনাগত সন্তানের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি আমাকে শিডিউল দিয়েছিলেন। এমনটা আজকাল ভাবা যায়! পরে ওই হাসপাতালের ডাক্তারের পরামর্শে চার-পাঁচ দিনের রেস্ট নেয়ার কথা থাকলেও তিনি মাত্র একদিন বিশ্রাম করেই আবার শুটিংয়ে যোগ দিলেন। এই অবস্থায় পুরো ছবির শুটিংও শেষ করেছে। এই হলো শাবানা।’

প্রিয় অভিনেত্রী শাবানাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে মতিন রহমান বলেন, ‘শাবানার জন্মদিনে তাকে শুভকামনা জানাই। যদিও দেশ থেকে সে দূরে থাকে। তারপরও প্রতিমূহুর্তে সে খোঁজ খবর রাখে বাংলাদেশের মানুষরা কেমন আছে? দেশের চলচ্চিত্রের অবস্থা কী? নিয়মিত কথা হয় তার সঙ্গে। যখন কোনো শিল্পী কলাকুশলীর বিয়োগ ঘটে তখন ফোন করে তাদের জন্য শোক জানায়, স্মৃতিচারণ করে, কাঁদে। তার মানে দূরে থাকলেও মনটা তার এখানেই পড়ে থাকে। আল্লাহ যেন তাকে সুস্থ রাখে, তার পরিবারের সবাইকে ভালো রাখে।’

প্রজন্মনিউজ২৪/মুজাহিদ

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন