বিআইডব্লিউটিএ’র নদী অভিযান, বছিলায় বৈধ জমি উচ্ছেদের অভিযোগ

প্রকাশিত: ০১ জুন, ২০১৯ ০৩:৪২:৪৫

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলায় জমির দলিল/ কাগজপত্র সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তাদের নদী উচ্ছেদ অভিযানের কারণে বিপাকে পরেছেন  কাটাসুর মৌজার কয়েকশো মানুষ। তাদের অভিযোগ, ‘উচ্ছেদ কার্যক্রমে অংশ নেয়া বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা অবৈধদের পাশাপাশি উদ্দেশ্যমূলকভাবে কিছু বৈধ জমির মালিকদেরও ভিটেমাটি ছাড়া করছে।

জমির মালিক, দলিল-পত্র, আদালতের রায় এবং এলাকাবাসী সুত্রে জানা গেছে, সিএস ম্যাপ, আরএস ম্যাপ, বন্ধোবস্ত আইন এবং মহামান্য হাইকোর্টের রীট পিটিশন নং ৩৫০৩/২০০৯ আইনের অপব্যবহার করে উদ্দেশ্যমূলকভাবেই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে বছিলার কাটাসুর মৌজার ১৩৭/৮৯০ নং দাগের ২৯৬৩ ও ২৯৬৭ নং দলিলে বন্দোবস্ত হওয়া জমিতে।

বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের (স্পেশাল অরিজিনাল জুরিসডিকশন) রীট পিটিশন নং ৩৫০৩/২০০৯ আদেশে দুইভাবে জরিপ কাজ সম্পন্ন করতে বলা হয়। প্রথমত: সিএস ম্যাপ অনুসারে জরিপ। দ্বিতীয়ত: আরএস ম্যাপ অনুসারে জরিপ। একই রায়ে আইনানুগভাবে প্রদত্ত বিলিবন্দোবস্ত সাপেক্ষে অবশিষ্ট সকল ভূমি সুচিহ্নিতকরণপূর্বক গত ৩০-১০-২০১০ তারিখের মধ্যে সরকারি পিলার স্থাপন করতে বলা হয়। কিন্তু পিলার স্থাপন করা হয় ২০১২ সালে। পরে সেখানে ২০১৪ সালে তরিঘড়ি করে পার্শবর্তী বছিলা গার্ডেন সিটির এমডি শামীম আহমেদ’র কারসাজিতে বিআইডব্লিউটিএ’র কিছু অসাধু কর্মকর্তা সরকারিভাবে আবারো নির্ধারিত সীমানা ছাড়াই বৈধ জমির ৫০০ ফিট ভেতর ৫টি পিলার অবৈধভাবে স্থাপন করে।

এরপর বিষয়টি নিয়ে জমি মালিকরা হাইকোর্টে মামলা করলে রায় অনুযায়ী পিলারগুলো সরিয়ে পুনরায় নির্ধারিত স্থানে স্থাপন করা হয়। এ বিষয়ের একটি মামলা এখনও হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। তবে হাইকোর্টের সেই রায় এবং চলমান মামলা উপেক্ষা করেই বৈধ জমিতে চলছে বিআইডব্লিউটিএ’র নদী উচ্ছেদ অভিযান।

এ বিষয়ে আমিন মোমিন হাউজিং এর মালিক মমিন মিয়া (৬৫) বলেন, ‘আমার পূর্বপুরুষরা (অর্থাৎ আমার বাবা-দাদা এবং দাদার বাবা) এই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। আমরা এখনও এই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। তিনি বলেন, এই জমি আমার জন্মের আগ থেকে অর্থাৎ ৭৪ বছর ধরে আমরা চাষ করে আসছি। ১৯২০ সালে এই যায়গাটি দেখতে নদীর মতো ছিলো। পরবর্তীতে প্রাকৃতিকভাবেই পর্যায়ক্রমে এটি ভরে গেলে চাষাবাদ শুরু হয়। ১৯৪৫ সালে আমরা (পূর্ব পাকিস্তান আমলে) এই জমি বন্দোবস্ত নেই। তার পর থেকে এই জমিতে ধান চাষ করে আসছি।

মমিন মিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ‘২০১২ সালে আমাদের এই জমি বালু দিয়ে ভরাট করি আমরা। তখন অবৈধভোবে জোরপূর্বক আমাদের এই জমি দখল করতে চেয়েছিলো স্থানীয় বছিলা গার্ডেন সিটির এমডি শামীম আহমেদ। এসময় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে তিনি আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমার যদি ২০ কোটি টাকাও খরচ হয় তবুও আমি তোর এই জমি কেটে খাল তৈরি করবো’ বলেন মমিন মিয়া।

মমিন মিয়া জানান, ‘সেই হুমকির পর থেকেই আমার বৈধ জমি নিয়ে ঝামেলা পাকানোর চেষ্টা হয়। শামীম আহমেদ সর্বশেষ গত ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে আমার জমিতে অবৈধভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করে। এরপর বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা আমাদের কোন কথা না শুনেই উদ্দেশ্যমূলক ও বিতর্কিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে আসছে।

জানতে চাইলে পার্শবর্তী বছিলা গার্ডেন সিটির এমডি শামীম আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমিন মোমিন হাউজিং এর জমি বৈধ নয়। ‌আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকলে তারা মামলা করুক।’

মমিন মিয়া জানান, ২৭-০৭-১৯৪৫ তারিখে ২৯৬৩ নং ও ২৯৬৭ নং দলিলে বন্দোবস্ত হওয়া এই জমিটি নিয়ে একটি মামলা বর্তমানে হাইকোর্টের আপিল ডিভিশনের (১১৪৬৬/১৪) রিট পিটিশনে বিচারাধীন রয়েছে। অথচ হাইকোর্টকে উপেক্ষা করেই বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিনের নেতৃত্বে ড্রেজার দিয়ে আমার বৈধ জমি খনন করে বালুগুলো বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। যা সম্পূর্ণভাবে বেআইনি ও অবৈধ।

এদিকে আমিন মোমিন হাউজিংয়ের মালিক মমিন মিয়ার ছেলে আমির হামজা গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘উচ্ছেদের নামে আমাদের বৈধ জমি কেটে সেই বালু অবৈধভাবে বিক্রি করে দিচ্ছে বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা। তিনি বলেন, শুধু তাই নয়, আমাদের বৈধ জমির বালু তুলে নিয়ে পাশের একটি খাল অবৈধভাবে ভরাট করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিআইডব্লিউটিএ’র এই অভিযান বিতর্কিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ। এটা এখন সবার কাছে পরিস্কার হয়ে গেছে। এ যেনো জোর যার মুল্লুক তার নীতি চলছে’ যোগ করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে বছিলায় অভিযান পরিচালনাকারী বিআইডব্লিউটিএ’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ওনারা (জমি মালিকরা) যে যুক্তি দেখাচ্ছেন তা সঠিক না।

জমি নিয়ে হাইকোর্টে একটি মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় আপনারা অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কিনা সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এই বিষয়ে ফোনে কথা বলতে চাই না। আপনি আমার সাথে দেখা করেন, তখন কথা বলবো। এই বলে তিনি লাইনটি কেটে দেন।

এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল একটি গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান যখন একটি কার্যক্রম করবে তখন তার একটি নীতিমালা থাকবে, কোন বর্বরতা থাকবেনা, সৌন্দর্যিত একটি ভূমিকা থাকবে, রাষ্ট্রের আইন সবাই মানবে। রাষ্ট্রের আইন যদি কেউ না মানে তাহলে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। কিন্ত কাগজ-পত্র না দেখে এবং নদী তীরের সীমানা নির্ধারণ ছাড়াই উদ্দেশ্যমূলকভাবে অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, বর্বোরোচিত হামলা, বর্বোরোচিতভাবে ভাঙ্গা, হয়রানি করা, কোন প্রকার নোটিশ দেয়া ছাড়াই মনগড়া ও ইচ্ছামতো অভিযান চালাচ্ছে বিআইডব্লিউটিএ। তারা কারো বাড়ি ভাঙছে আবার কারোটো রেখে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, বিআইডব্লিউটিএ সিএস, আরএস, এসএ পর্চা, হাইকোর্টের রায় এবং  কোন আইন ও নীতিমালা মানছে না বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা। এই অভিযান কোথায়ও কোথায়ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে আশরাফ-উল মজিদ (৫৩) নামের একজন জমির মালিক প্রশ্ন রেখে বলেন, ১৯২০ সালের আগে প্রাকৃতিকভাবে ভরাট হওয়া এবং বন্ধোবস্ত হওয়া জমিতে বিআইডব্লিউটিএ কোন আইনে কোন যুক্তিতে উচ্ছেদ চালায়? তিনি বলেন, যেহেতু এই জমি নিয়ে হাইকোর্টে একটি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে এমতাবস্থায় সকল দিক থেকে এই বৈধ জমিতে কোনভাবেই বিআইডব্লিউটিএ উচ্ছেদ অভিযান চালাতে পারে না। কিন্তু তারা গায়ের জোরে বালুগুলো বিক্রি করে দিচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে জানা গেছে, তিনি অসুস্থ হয়ে এখন ভারতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার অসুস্থতার বিষয়ে তিনি নিজেই তার ফেসবুকে একটি পোস্ট করে জানিয়েছেন।

বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তাদের বক্তব্য হলো- সিএস ম্যাপ অনুযায়ী ১৩৭/৮৯০ নং দাগে নদীর ২৫০ ফিট খাল ছিলো। সুতরাং তারা ওই সিএস ম্যাপকেই অনুসরণ করবে। এই সিএস ম্যাপ তৈরি হয় ১৯১২ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে। পরবর্তীতে সেখানে চর পরার কারণে যে জমি বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে সেগুলোর বৈধ কাগজ-পত্র এবং কোর্টের রায় কোন কিছুকেই পরোয়া করেনি বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে-রীট পিটিশন ৩৫০৩/২০০৯ এর রায়ে পরিস্কারভাবে বলা আছে যে- সিএস ম্যাপ শুধুমাত্র নদীর সীমানা নির্ধারণের প্রাথমিক মাপকাঠি। যা চূড়ান্ত নয়।

আরো উল্লেখ্য যে- বহুপূর্বে প্রস্তুতকৃত সিএস ম্যাপে প্রদর্শিত নদীর স্থানে অনেকাংশই চর পরে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই সকল নতুন চরভূমি বিলিবন্দোবস্ত করে থাকতে পারে। যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আইনানুগভাবে বিলিবন্দোবস্তকরণ ব্যতিরেকেই কেউ দখলদার থাকেন তাহলে সরকার তাকে উচ্ছেদ করার জন্য যথাযথ আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। উপরোক্ত আইনগত অবস্থানের সাথে বাংলাদেশ-উত্তর প্রস্তুতকৃত আরএস খতিয়ান ও ম্যাপের সাথে মিল রেখে নদীর সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা যে বলছেন তারা শুধু সিএস ম্যাপকেই অনুসরণ করবে তা সম্পূর্ণ ৩৫০৩/২০০৯ এর রায়ের পরিপন্থী।

এই জমির মামলাটি বর্তমানে হাইকোর্টের আপিল ডিভিশনের (১১৪৬৬/১৪) রিট পিটিশন বিচারাধীন থাকা অবস্থায় এবং হাইকোর্টের আপিল নিশ্পত্তি হওয়ার আগেই কেন অভিযান চালানো হচ্ছে এবং কাগজ-পত্র যদি ভুয়া ও জাল হয় তাহলে আদালত কেনো জমি মালিকদের পক্ষে সীমানা নির্ধারণের বিষয়ে রায় দিলো তার কোন সুদুউত্তর পাওয়া পায়নি বিআইডব্লিউটিএ’র এই কর্মকর্তার কাছে।

সরেজমিনে গিয়ে জমি মালিক ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা ৮৯১ এবং ৮৯২ দাগের জমির স্থাপনা বৈধ দাবি করলেও ৮৯০ দাগের জমি বলছে অবৈধ। কিন্তু জমি মালিকরা বলছেন, ‘সকল কাগজ-পত্রেই আমাদের জমি বৈধ, আমাদের বৈধ জমি যতটুকু আছে তা আমাদের বুঝিয়ে দেয়া হোক।’

জমি মালিকরা জানান, জমিটি ১৯২০ সালের আগে (পূর্ব পাকিস্তান) দেখতে নদীর মতো ছিলো। যা পর্যায়ক্রমে প্রাকৃতিকভাবে ভরাট হয়ে যায়। তৎকালীন সময়ে বর্ষায় নদীটিতে পানি থাকতো এবং ধান চাষসহ ফসল উৎপাদন করা হতো।

৭৫ বছর বয়সের নুর মোহাম্মদ জানান, ‘বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা বলছেন এটা নদীর জমি। আমি ছোটবেলা থেকে এখানে বসবাস করি এখানে আমি কখনোই নদীই দেখিনাই। এগুলো একসময় ধান চাষের জমি ছিলো। ম্যাপে যেটুকু নদীর কথা বলা হচ্ছে সেখানে সরকারি পিলার স্থাপন করা আছে। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা সীমানা ছেড়ে আমাদের বৈধ মালিকানা জমি থেকে উচ্ছেদ অভিযানের নামে বালু বিক্রি করতেছে। যা অত্যান্ত নিন্দনীয়।’

সেখানের একখন্ড জমির মালিক অসহায় এক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো: দুলাল মিয়া। তিনি বলেন, ‘তার জীবণের শেষ সম্বলটুকু কেটে নদীর নামে খাল তৈরির চেষ্টা চলছে। তিনি কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, ‘আমাদের বৈধ জমির পক্ষে হাইকোর্টেরও রায় আছে। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ সেই রায় উপেক্ষা করে যেন হাইকোর্টকেই হাইকোর্ট দেখাচ্ছে।’

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ