সড়ক-রেলপথ অবরোধ, টায়ারে অগ্নিসংযোগ

ধর্মঘটে পাটকল শ্রমিকরা

প্রকাশিত: ০৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০৯:৫০:৩২

মজুরি কমিশন, পাট খাতে অর্থ বরাদ্দ, বদলি শ্রমিকদের স্থায়ীকরণসহ নয় দফা দাবিতে পাটকল শ্রমিকদের ধর্মঘটে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের প্রধান প্রধান পাঠকল এলাকা। একই সঙ্গে বেলা ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ কর্মসূচিও রয়েছে তাদের। গতকাল সড়কপথ অবরোধ করে, টায়ারে আগুন দিয়ে শ্রমিকরা ধর্মঘট পালন করছেন। রেলপথ অবরোধ করায় কয়েকটি ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। পাটকল শ্রমিকদের ধর্মঘটে স্থবির হয়ে পড়েছে ধর্মঘট অধ্যুষিত এলাকা।

 যান চলাচল বন্ধ থাকায় প্রভাব পড়েছে এলাকাবাসীর দৈনন্দিন কর্মকান্ডেও। ধর্মঘট পালনের ওপর আমাদের বিভিন্ন বুরোর পাঠানো রিপোর্ট:

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন বিভিন্ন পাটকলের শ্রমিক-কর্মচারীরা। এতে বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে শ্রমিকেরা। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার ভোর থেকে সড়কে নামেন পাটকল শ্রমিকেরা। মহানগরী ও জেলার রাষ্ট্রায়ত্ত ১০টি পাটকলের সামনে বিক্ষোভ হয় বলে জানান শ্রমিক নেতারা।

 নগরীর আমিন জুট মিলের শ্রমিকরা মিলের সামনে সড়কের উপর শুয়ে-বসে, বিভিন্ন ধরনের যানবাহন আড়াআড়িভাবে রেখে বিক্ষোভ করেন। সড়কের ওপর টায়ারেও আগুন দেয়া হয়েছে। বিক্ষোভের কারণে আমিন জুট মিলের সামনের সড়ক দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ তাদের একপাশে সরিয়ে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করে। একই সময়ে সীতাকুন্ডে রেললাইন অবরোধ করে শ্রমিকেরা।

 এ কারণে সোনার বাংলা, সুবর্ণসহ কয়েকটি ট্রেন সেখানে আটকা পড়ে। আধা ঘণ্টা পর এসব ট্রেন ওই এলাকা অতিক্রম করে বলে জানান রেল কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন ১০টি পাটকলের মধ্যে আছে- আমিন জুট মিলস লিমিটেড ও ওল্ড ফিল্ডস লিমিটেড, গুল আহমেদ জুট মিলস লিমিটেড, হাফিজ জুট মিলস লিমিটেড, এমএম জুট মিলস লিমিটেড, আর আর জুট মিলস লিমিটেড, বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরী লিমিটেড, কর্ণফুলী জুট মিলস লিমিটেড, ফোরাত কর্ণফুলী কার্পেট ফ্যাক্টরি, গালফ্রা হাবিব লিমিটেড ও মিলস ফার্নিসিং লিমিটেডের শ্রমিকেরা অবরোধ কর্মসূচি পালন করে।

 সীতাকুন্ড (চট্টগ্রাম) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, সারা দেশের মতো সীতাকুন্ড উপজেলায় ও পাটকল শ্রমিকদের ৯ দফা দাবি আদায়ে রাজপথ, রেলপথ অবরোধ পালিত হয়েছে। এ সময় গুল আহম্মদ জুট মিলস, হাফিজ জুট মিলস, গালফ্রা হাবিব জুট মিলস, আর আর জুট মিলসসহ পাটকল শ্রমিক কর্মচারীরা সড়কে অবস্থান করে। তবে এদিন সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সড়কে অবস্থান করার পর পুলিশ তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে চাইলে পুলিশের সাথে কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় পুলিশ তাদের ধাওয়া করলে তারা সড়ক থেকে সরে যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করার পরে রেলপথ অবরোধ করে শ্রমিকেরা। পরে পুলিশ তাদেরকে ধাওয়া দেয়। এ সময় শ্রমিকরা রেললাইনের উপর শুয়ে পড়ে।

খুলনা ব্যুরো জানায়, পাটকল শ্রমিকদের ধর্মঘটে ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে খুলনার শিল্পাঞ্চল খালিশপুর নগরী। তারা রাস্তা অবরোধ করে, টায়ারে আগুন লাগিয়ে ধর্মঘট পালন করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত¡ পাটকল শ্রমিকদের মজুরি কমিশন নিয়ে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না কারায় দ্বিতীয় ধাপে চারদিনের কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে ধর্মঘট পালন করছেন শ্রমিকরা। গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব নয়টি পাটকলে টানা ৭২ ঘণ্টা ধর্মঘট পালন করছেন তারা। ধর্মঘটের এ তিনদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চার ঘণ্টা করে রাজপথ অবরোধেরও কর্মসূচি রয়েছে শ্রমিকদের।

 মজুরি কমিশন, পাট খাতে অর্থ বরাদ্দ, বদলি শ্রমিকদের স্থায়ী করণসহ নয় দফা দাবিতে পাটকল শ্রমিক লীগ সিবিএ-ননসিবিএ পরিষদের ডাকে এ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। খুলনা-যশোর অঞ্চলের নয় পাটকলের শ্রমিকরা মিলের উৎপাদন বন্ধ রেখে ধর্মঘট ও সড়ক অবরোধ কর্মস‚চি পালন করছেন। মহানগরে নতুন রাস্তার মোড়ের কবির বটতলা সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন।

আন্দোলনরত শ্রমিক নেতারা বলেন, সরকার ঘোষিত জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন-২০১৫ সুপারিশ বাস্তবায়ন, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক কর্মচারীদের পি. এফ. গ্র্যাচুইটি ও মৃত শ্রমিকের বিমার বকেয়া প্রদান, টার্মিনেশন, বরখাস্ত শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল, শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগ ও স্থায়ী করা, পাট মৌসুমে পাটক্রয়ের অর্থ বরাদ্দ, উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে মিলগুলোকে পর্যায়ক্রমে বিএমআরই করাসহ নয় দফা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিলো। কিন্তু আমাদের দাবিগুলো এখনও বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমরা রাজপথে আবার নামতে বাধ্য হয়েছি।

 বাংলাদেশ পাটকল শ্রমিক লীগের খুলনা-যশোর অঞ্চলের আহ্বায়ক ও ক্রিসেন্ট জুট মিলের সিবিএ সভাপতি মুরাদ হোসেন বলেন, বিজেএমসি চেয়ারম্যান গত ২৮ মার্চের মধ্যে মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন করার আশ্বাস দিয়েছিলেন কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। দাবি আদায়ে বাধ্য হয়ে আবারও আন্দোলনে নামতে হয়েছে। তিনি জানান, খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত¡ ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, আলিম, ইস্টার্ন এবং যশোরের কার্পেটিং ও জেজেআই জুট মিলে বর্তমানে ১৩ হাজার ২৭১ জন শ্রমিক কর্মরত রয়েছে।

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, বকেয়া বেতনভাতাসহ ৯ দফা দাবিতে তৃতীয় দিনের মতো মহাসড়কে শুয়ে অবরোধ করে বিক্ষোভ ও লাঠি মিছিল করেছেন রাজশাহী জুট মিলস শ্রমিকরা-কর্মচারীরা। সহস্রাধিক শ্রমিক-কর্মচারী গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কাটাখালীতে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেন। তারা বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন এবং দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন স্লোগান দেন। সেখানেই তারা সমাবেশ করেন।

 এদিকে গত রোববার থেকে লাগাতার ৭২ ঘণ্টা আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে রাজশাহী জুট মিলস শ্রমিক-কর্মচারীরা। এদিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের বিক্ষোভ ও অবরোধের কারণে প্রায় ২ ঘণ্টা রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। শ্রমিক-কর্মচারীরা মহাসড়কে শুয়ে পড়েন। ফলে সড়কের দুই ধারে কয়েক হাজার যানবাহন আটকা পড়ে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের অনুরোধ করে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এ সময় ওই মহাসড়কে আবারও যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আসে।

 বিক্ষুব্ধ জুট মিলস শ্রমিক-কর্মচারীরা বলেন, গত জানুয়ারি মাস থেকে তাদের বেতনভাতা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বকেয়া বেতন, মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন ও উৎসবভাতাসহ ৯ দফা দাবিতে গত রোববার থেকে শ্রমিক-কর্মচারীরা এ আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করেছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। রাজশাহী জুট মিলস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জিল্লুর রহমান জানান, আগে তাদের বেতনভাতা ও মজুরি ছিল ৪ হাজার ১৫০ টাকা। বর্তমানে সর্বনিম্ন ৮ হাজার ৩০০ টাকা ঘোষণা হলেও তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে তারা নতুন বেতনস্কেলে কোনো বেতন মজুরি পান না।

 এতে পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা সঙ্কটে পড়েছেন। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের সামনে কোনো পথ নেই। শ্রমিক-কর্মচারীরা আরও জানান, চলমান কর্মসূচি শেষ হলে আবারও নতুন আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রাখবেন। কাটাখালী থানার ওসি নিবারণ চন্দ্র বর্মণ বলেন, মহাসড়ক থেকে জুট মিলের বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ