বইয়ের চাপে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা

প্রকাশিত: ১৩ মার্চ, ২০১৯ ০৩:২৮:০১

এম এ মামুন হাসান,স্টাফ রিপোর্টার: ‘স্কুলের ব্যাগটা বড্ড ভারী, আমরা কী আর বইতে পারি, এও কি একটা শাস্তি নয়। কষ্ট, কষ্ট হয়। আমার কষ্ট বুঝতে চাও, দোহাই পড়ার চাপ কমাও -কষ্ট হয়, কষ্ট হয়।’

শিশুরা চায় স্বাধীনভাবে বাঁচতে; কিন্তু তাদের কাঁধে বইয়ের চাপ দেখে মনে হয়, বই বহন করার জন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। রাজধানীর প্রতিটি স্কুলের পাশাপাশি গ্রামগুলোতেও এমন দৃশ্য আজ আর নতুন নয়।

ছোট ছাত্রছাত্রীদের কাঁধে ব্যাগ দেখে মনে হয়, তারা পড়তে নয়, বই বহন করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। নতুন বই হাতে পেয়ে আনন্দিত যে শিক্ষার্থী, কিছুদিন পরেই তার মাঝে সেই আনন্দ আর থাকে না।

বরং বইয়ের চাপে দিশেহারা হয়ে ওঠে তারা। বোর্ডের বইয়ের পাশাপাশি সরকারি বেসরকারি স্কুলগুলোতে সহায়ক বইয়ের বাড়তি চাপেও রয়েছে কোমলমতি শিশুশিক্ষার্থীরা।

বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত তিনটির বাইরে আরও ছয় থেকে দশটি বই প্রায় সব বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়গুলোতে দেওয়া হয়।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বোর্ডের বাংলা, ইংরেজি, অংক – এ তিনটি বিষয়ের সঙ্গে সহায়ক হিসেবে ধর্ম, পরিবেশ-পরিচিতি, বিজ্ঞান, ওয়ার্ড বুক, চিত্রাঙ্কন, বাংলা ও ইংরেজি হাতের লেখা শেখার, সাধারণ জ্ঞান, নামতা-গুণ-ভাগ-জ্যামিতি আছে

এমন একটি গণিত বই, ব্যাকরণ, গ্রামার, গল্প ও কবিতার এবং কম্পিউটার শিক্ষা সংক্রান্ত বই দেওয়া হয়ে থাকে।তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, বিজ্ঞান ও ধর্ম – এ ছয়টি বোর্ডের বইয়ের সঙ্গে সহায়ক হিসেবে দেওয়া হয় মূলত

ব্যাকরণ, গ্রামার, কম্পিউটার, চিত্রাঙ্কন এবং দ্রুত পঠন ধরনের দুই থেকে ছয়টি বই। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে এসব বইয়ের সংখ্যা আরও অনেক বেড়ে যায়।

আবার স্কুল থেকেই সরাসরি কোচিংয়ে যায় অনেক শিশু, সঙ্গে বয়ে নিয়ে যায় সেসব বই-খাতাও। নোট বই, গাইড বইও সঙ্গে নিয়ে আসে অনেকে। বই, খাতা, কলম, ডায়েরি, পেনসিল বক্স, জ্যামিতি বক্স, স্কেলেই ব্যাগ ভারি হয়ে যায়, টিফিন বক্স ও পানির বোতল তো আছেই।

এত বই শিশুদের প্রয়োজন, না কি এর পেছনে বই ব্যবসায়ীরা সক্রিয়?

আমরা জানি, শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধির সময়  ১৮ বছর পর্যন্ত। এ সময়টাতে শিশুদের হাড় ও মাংসপেশি অপরিণত ও নরম থাকে।এদিকে ভারি স্কুলব্যাগ নিয়ে বাচ্চাদের সিঁড়ি বেয়েও উঠতে হয়। এতে ঘাড় সামনে বা পেছনের দিকে কুঁজো হয়ে যায়। ভারি স্কুলব্যাগ বহন করার কারণে শিশুদের ঘাড়, পিঠ ও মাথা ব্যথা হতে পারে। শ্বাসকষ্ট হতে পারে, মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যেতে পারে, এমনকি শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তারপরও দিনে দিনে শিক্ষার্থীদের ওপর বইয়ের চাপ বাড়ছেই। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থারই ত্রুটি। ঠিকঠাক সব কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বাড়তি বই। পুঁথিগত বিদ্যার ওপরই বেশি জোর দেওয়া হয়।

তাই বয়সেরতুলনায় বেশি বই ছাত্রছাত্রীদের শুধু বহন করতেই হয় না, মুখস্থও করতে হয়।এভাবে আনন্দময় না হয়ে পড়াটা শিশুদের কাছে হয়ে ওঠে কষ্টকর কোনো কিছু। ক্লাস, কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, বাড়ির কাজ- এত চাপ সামাল দেওয়া শিশুর পক্ষে অনেক কঠিন।

এভাবে বেশি চাপে শিশুরা পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। নষ্ট হতে পারে সৃষ্টিশীল মেধা।

কোনো কিছু চাপিয়ে দিলে তা শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক অভিভাবকও বোঝেন, বাচ্চাদের ওপর বেশি বিষয়ের বই চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

কিন্তু তারপরও বর্তমান প্রতিযোগিতার যুগে টিকে থাকতে তারা উঠেপড়ে নামেন। আমরা হয়তো ভুলেই যেতে বসেছি, পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা, বিনোদন ও পর্যাপ্ত ঘুমেরও দরকার আছে।

তাই শিশুদের কাঁধে অতিরিক্ত বইয়ের চাপ কমিয়ে সুষ্ঠু মানসিকতায় পড়ালেখা করতে সহযোগিতা করা প্রতিটি অভিভাবকের দায়িত্ব।

প্রজন্মনিউজ২৪/

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ