প্রকৃতিপ্রেমিদের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান

প্রকাশিত: ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০৪:০৪:২১ || পরিবর্তিত: ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০৪:০৪:২১

হাসান আল মারুফ : ভ্রমন সবার কাছেই প্রিয় আর সেটি যদি হয় প্রাকৃতিক ঘেরা অঞ্চলে তাহলে কোন কথাই নেই। এর মধ্যে সাতছড়ি জাতীয় অন্যতম। বিশাল এলাকা জুড়ে এই বনে আছে বন মোরগ, হরিণ, ভাল্লুক বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, বানর সহ আরো কয়েক প্রজাতির পশুপাখি প্রকৃতিপ্রেমি আর ফটোগ্রাফার দের জন্য আদর্শ একটি যায়গা। সাথে দক্ষিন এশিয়ার সর্ববৃহৎ সুরমা চা বাগান দেখা। দিনে গিয়ে রাতের মধ্যেই ফিরে আসা যায় সাথে ট্রেন ভ্রমণের মজা তো আছেই।

বনে ঘুরার জন্য ৩ টি ট্রেইল রয়েছে:

আধ ঘন্টার ট্রেইলঃ- আধা ঘন্টার এই ট্রেইলে বনের ভিতর অবস্থিত গ্রাম টিপড়া পাড়া তে যাওয়া যায়।

এক ঘন্টার ট্রেইলঃ- ১ ঘন্টার এই ট্রেইলে কয়েক প্রজাতির পশু-পাখি দেখা যায়।

তিন ঘন্টার ট্রেইলঃ- আগরের বন আর বিভিন্ন রকম উদ্ভিদ-পশুপাখির দেখার জন্য এই ট্রেইল আদর্শ।

আমরা এক ঘন্টার ট্রেইলে গিয়েছিলাম। পরে দেখি হাতে অনেক সময় ই ছিলো। কারণ ৩০-৪০ মিনিটেই ট্রেইল শেষ।তাই আফসোস করেছিলাম তিন ঘন্টার ট্রেইলে না যেয়ে। আমরা অবশ্য একটি সাপ,বন মুরগী, বানর আর পাখি দেখতে পেয়েছিলাম। তবে আমাদের কয়েকজনের পূর্বে ট্রেকিং এর অভিজ্ঞতা থাকায় ভালোই লেগেছে। খুব ভোরে আর সন্ধ্যায় নাকি হরিণের দেখা মিলে। এক ঘন্টার ট্রেইল মনে করি তিন ঘন্টার ট্রেইল টি অনেক এডভেঞ্চারাস হবে। সাতছড়ি উদ্যানে ঢুকতেই একটি ওয়াচ টাওয়ার আছে! অবশ্য ভুলে সেটাতেই উঠা হয়নি। প্রকৃতিপ্রেমিদের জন্য অসাধারণ একটা জায়গা।

উদ্যান প্রবেশ গেটের উলটো পাশেই রয়েছে গত বছর চালু হওয়া ট্রি এক্টিভিটি। জন প্রতি ১০০ টাকায় এই ট্রি এক্টিভিটি করতে পারবেন। মোট ৫ টি স্টেপ আছে! আমরা ছিলাম ৬ জন। একজন বাদে আমরা সবাই সবগুলোই কম্পলিট করেছিলাম। এটার অভিজ্ঞতা টা অসাধারণ মূলত যাওয়ার উদ্দেশ্যেই ছিলো ট্রি এক্টিভিটি। এরপর উদ্যান থেকে বের হয়ে ১-২ মিনিট দূরেই একটি দোকান।দারুন একটা ডিমমুড়ি বানায়। আর ৫-৭ মিনিট দূরেই আছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় সুরমা চা বাগান। সেটাও ঘুরে দেখবেন। নোয়াপাড়ায় লাঞ্চ করার পরেও দেখি ট্রেন আসতে ২ ঘন্টা বাকি ঠিক তখনি ৪:২০ এ সিলেটের উদ্দেশ্য যাবে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস স্টেশনে হাজির। আমাদের টিকেট শায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত করাই ছিলো ব্যাস উঠে গেলাম শায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত আধ ঘন্টার আরেকটা ট্রেন জার্নি। ৫:৫০ এর ট্রেন ২০ মিনিট লেট এ ৬:১০ এ আসে শায়েস্তাগঞ্জ সেখান থেকেই উঠে চলে আসি বিমানবন্দর স্টেশন।

সতর্কতাঃ- গাইডের ভাষ্যমতে ৩ ঘন্টার ট্রেইলে উনি নিজেও মাঝেমধ্যে রাস্তা ভুলে যায়। কারণ কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তা ভাগ হয়ে যায়। গাইডে সাথে আমাদের একজন একটু বেশি এগিয়ে যাওয়ায় আমরাও কোনদিকে যাবো সেটা ধরতে পারছিলাম না।আর বনে সাপ সহ বেশ কিছু হিংস্র প্রানী থাকায় গাইড নেওয়াই উত্তম। এবার শীতে নাকি ২-৩ জন ছেলে মেয়ে রাস্তা ভুল করে সারারাত বনেই কাটাইছে পরেরদিন খুজতে খুজতে একরাস্তা দিয়ে বের হতে পারছিলো। আর বনের ভিতর কোনো গাছে হাত দেওয়ার আগে ভালো করে দেখবেন কারণ আমাদের একজন ট্যুর মেট ছবি তুলতে গাছের সামনে দাড়াইছিলো হটাৎ দেখি লাফ দিছে আর একটা সবুজ লম্বা সাপ দ্রুত আরেক গাছে গেলো! এমন ভাবে ছিলো বুঝার উপায় নাই এখানে একটা সাপ আছে! গাছের পাতার রঙয়ের সাথে মিশে যায়। গাইড সাপের নামটা বলছিলো খেয়াল নাই। খুব বিষাক্ত নাকি আর সেখানে ভ্যাক্সিন এর ব্যবস্থাও নাই কামড়ালে সিলেট নেওয়ার আগেই নাকি মারা যাবে। তাই সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

ট্রি এক্টিভিটির ১ম ২ টা ধাপ ই কঠিন।বাকি গুলো পার করা সহজ ই তুলনামূলক।তবে ভয় পেলে পারবেন না।আমাদের ৬ জনের মধ্যে একজন ২য় ধাপেই পড়ে গেছিলো।২য় ধাপ টাই সবচেয়ে কঠিন ওজন বেশি হওয়ায় কাঠের সিড়ি গুলো অনেক নাড়াচাড়া করছিলো!এক পর্যায়ে বেশি ভয় পেতে হাত ছেড়ে দেয়।শরীরের বেল্ট ক্যাবলের সাথে বাধা থাকে বিধায় যদি পড়েও যান তাও ক্যাবলের সাথে ঝুলবেন নিচে পড়বেন না। পড়ে মই দিয়ে ওরে নামানো হইছিলো।তাই উঠার আগে যদি মনে হয় পারবেন তাহলেই করবেন।তবে যার করেছেন আশা করি ভালোই এডভেঞ্চারাস ফিল পাইছেন।অসাধারণ একটি এক্টিভিটি।

সিএনজি/অটো যাই ভাড়া করেন না কেনো অনেক দামাদামি করে নিবেন। ট্যুরিস্ট দেখলেই এরা অনেক ভাড়া চায়। আর কোথায় কোথায় ঘুরবেন সবকিছু আগেই বলে রাখবেন। ট্রেনের জানালা বন্ধ রাখবেন সিলেট থেকে ঢাকাগামী ট্রেনে চুরি হওয়া আর পাথর মারা এটা নিত্যদিনের ব্যাপার। আমাদের বগিতেও একজন মহিলার ব্যাগ ছাদের থেকে টান দিয়ে নিয়ে গেছে। আর জানালা গ্লাসে পাথর মারা তো আছেই। যেকোনো দূর্ঘটনাই ঘটতে পারে। তাই সাবধান থাকা দরকার। যাওয়ার আগে গ্রুপে কিছু পোস্টে দেখলাম অনেক গাইড আছে দামাদামি করে নিবেন! আসার সময় গাড়ি পাওয়া যায় না তাই রিজার্ভ সিএনজি/অটো নেওয়া ভালো।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে গাইড একজন ই আর তার দোকান আছে সেখানে তাকে ডেকে আনতে হয় কারো গাইডের দরকার পড়লে। কারণ সেখানে কোনো সিমের নেটওয়ার্ক নাই যে কল দিবে। আর ট্রি এক্টিভিটি টাও ওই গাইডের নিজের করা। গাইড না লাগলেও ট্রি এক্টিভিটির জন্য উনাইকেই আনতে হবে।আর এখন গাড়ি ও এভেইলেবল। সাতছড়িতে কোনো সিমের ই নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না।মাঝমধ্যে কিছু যায়গায় পাওয়া যায়। পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি সাথে নিবেন বনের ভিতর কোথাও পানি পাবেন না এর আশেপাশে চাইলে চুনারুঘাট এর গ্রীনল্যান্ড পার্কে যেতে পারেন! তবে আগে গ্রীনল্যান্ড পার্ক যেয়ে পড়ে সাতছড়ি ঘুরলে ভাড়া কম পড়বে। নাহলে খরচ ও দুইটাই যাবে। আমরা অবশ্য যাইনি। গাইড বললো এতো ভাড়া দিয়ে যাওয়ার মতো সুন্দর না। নোয়াপাড়া থেকে ড্রীমল্যান্ড পার্ক সিএনজি ভাড়া ১০০০-১২০০ টাকা চায় আমাদের ড্রাইভার মামা বললো।

যেভাবে যাবেনঃ- ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে সকাল ৭:১০ এ পারাবত এক্সপ্রেস (কমলাপুর থেকে ৬:৩৫) সিলেটের উদ্দেশ্য ছেড়ে যায়। সাতছড়ি যেতে হলে নামতে হবে নোয়াপাড়া স্টেশন। সকাল ১০ টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন।স্টেশনে নেমে প্লাটফর্মে বিপরীত পাশেই নোয়াপাড়া বাজার সেখান থেকে সিএনজি/অটোতে সরাসরি সাতছড়ি যেতে পারবেন। চাইলে শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশনেও নামতে পারেন সেখান থেকে চুনারুঘাট সিএনজি/অটোতে সেখান থেকে বাসে সাতছড়ি। আমরা নোয়াপাড়া স্টেশনেই নেমেছিলাম। আসার সময় একি ভাবে সিএনজি /অটোতে নোয়াপাড়া বাজার স্টেশন। সেখান থেকে বিকাল ৫:৫০ এ শায়েস্তাগঞ্জ অথবা ৬:২০ এ নোয়াপাড়া থেকে পারাবত এক্সপ্রেস ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। ৯:৩০ এর মধ্যেই এয়ারপোর্টে পৌঁছে যায়।

খরচঃ- ঢাকা থেকে ট্রেনে নোয়াপাড়া /শায়েস্তাগঞ্জ ২১৫ টাকা টিকেট তবে সিট পেতে হলে সিলেটের টিকেট ই কাটতে হবে নইলে কাউন্টার থেকে বলে সিট নাই! আর যাওয়ার দিন সকালে টিকেট কিনতে গেলে বিশাল লাইন পাবেন! টিকেট পেতে দূর্ভোগ পোহাতে হবে। আবার আমরা যে সিএনজি নিয়েছিলাম আমাদের ঘুরতে ১ ঘন্টার বেশি দেরি হওয়ায় আসার সময় অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করে পরে গাইডের কথায় তাকে অতিরিক্ত ১০০ টাকা দিয়ে ছেড়ে দেই।আসার সময় এভেইলেবল সিএনজি/অটো পাবেন তাই রিজার্ভ এর প্রয়োজন দেখি না। পরে আসার সময় চা বাগান ঘুরে স্টেশন আসি অটোতে ৩০০ টাকায়! এখানেও অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করবে তাই ঠিকভাবে দামাদামি করেন নিবেন। আমাদের কাছে ৬০০ টাকা চাইছিলো ৩০০ টাকায় রাজী করাইছি।

ট্রেনে নোয়াপাড়া / শায়েস্তাগঞ্জ - ২১৫ টাকা। নোয়াপাড়া থেকে সিএনজি ৩৫০ টাকা (মূল ভাড়া ২৫০ + ১০০ টাকা অপেক্ষার জন্য অতিরিক্ত দিয়েছিলাম) ট্রি এক্টিভিটি - জনপ্রতি ১০০ টাকা গাইড খরচ - ৩০০ টাকা (১ ঘন্টার ট্রেইল) ( ৩ ঘন্টার টা ৭০০ টাকা) সাতছড়ি তে এন্ট্রি টিকেট স্টুডেন্ট কার্ড থাকলে ১৫ টাকা (এমনিতে ২৫ টাকা) আসার সময় অটোতে ৩০০ টাকা (সুরমা চা বাগান ঘুরে স্টেশন পর্যন্ত) চা বাগানে না গেলে আরো কমে পাবেন।আসার সময় টিকেট স্পনসর পাওয়াতে আর নিজেদের পকেট খরচা হয় নি। দুপুরের লাঞ্চ এছাড়া খাবার খরচ যার যার খরচের উপর নির্ভর করে তাই সেটি দিলাম না। আমাদের জনপ্রতি ৬৮০ টাকার মতো পড়েছে খাবার খরচ সহ।

প্রজন্মনিউজ২৪/আব্দুল কাইয়ুম

 

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন