পাঠকের চোখের সামনে কোনো বাড়তি পর্দা দিতে রাজি নই আমি

প্রকাশিত: ১৩ মে, ২০১৬ ১১:১১:১৮

অ্যালেক্স ডুয়েবেন: দি সিম্প্যাথাইজার উপন্যাস লেখার পরিকল্পনাটির শুরু কীভাবে?
ভিয়েত থান ন্গুয়েন: একজন গুপ্তচরের জীবন নিয়ে এ উপন্যাসের যাত্রা শুরু হয়। শৈশবে বেড়ে উঠতে উঠতে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে পড়া বিভিন্ন বইতে দক্ষিণ ভিয়েতনামে অবস্থানকারী অনেক কমিউনিস্ট গুপ্তচরের কথা জানতে পারি। সেই থেকে গুপ্তচরদের জীবনপ্রণালি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠি। বলা যেতে পারে, আমি এমন একটি উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম যেখানে সরাসরি রাজনীতি, ইতিহাস ও যুদ্ধের গল্প থাকবে; এবং একই সঙ্গে এটি হবে একটি আনন্দাখ্যানও। তাই মনে হলো, একজন গুপ্তচরই এতগুলো বিষয় ফুটিয়ে তুলতে আমাকে সাহায্য করবে।
অ্যালেক্স: গ্রাহাম গ্রিন, জন লে কার্-এর মতো বিখ্যাত সাহিত্যিকদের বই পড়ে বড় হয়েছেন আপনি। তাঁদের গল্পে একটি বিশেষ ধারণার বিস্তার যেমন আছে, তেমনি রয়েছে প্রমোদের রসদও।
ভিয়েত থান: কলেজ পেরোনোর আগ পর্যন্ত লে কারকে তেমনভাবে পড়া হয়ে ওঠেনি। তবে কৈশোরকালে প্রায় সব ধরনের কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাস পড়েছি। কিছু কিছু সিরিয়াসধর্মী গোয়েন্দা কাহিনিও পড়েছি। তা ছাড়া আমি যেহেতু ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে খুব আগ্রহী ছিলাম, মাত্র ১২ বছর বয়সেই লেরি হ্যানিম্যানের ক্লোজ কোয়ার্টারস পড়ে শেষ করেছিলাম। সত্যিই গা শিউরে ওঠার মতো গল্প। সেই গল্প আজও ভুলতে পারি না আমি। ক্লোজ কোয়ার্টারস-এ হ্যানিম্যান যে শক্তির ব্যবহার করেছিলেন, সেটিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার মতো একটি উপন্যাস লেখার ইচ্ছা আমার বরাবরই ছিল।
অ্যালেক্স: হ্যানিম্যানের ওই লেখার কোনো বিশেষ দিক কি আপনি দি সিম্প্যাথাইজার-এ দেখানোর চেষ্টা করেছেন?
ভিয়েত থান: হ্যানিম্যানের উপন্যাসটি লেখা একজন সাধারণ আমেরিকান যুবককে নিয়ে, যে যুদ্ধে গিয়ে অস্বাভাবিক অত্যাচারী ব্যক্তিতে পরিণত হয়। এখানে বহু অমানবিক ঘটনা রয়েছে। বইটির শেষ অধ্যায় দলবদ্ধ ধর্ষণ—অত্যন্ত ভয়ানক একটি ব্যাপার। ওই কাঁচা বয়সে এমন পাশবিকতার চিত্র আমার মনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। ভেবেছিলাম এমনটি লেখক না দেখালেও পারতেন। তবে পরিণত বয়সে উপন্যাসটি পড়ে হ্যানিম্যানকে প্রশংসা না করে পারি না। তিনি ওই ঘটনাটিকে বিন্দুমাত্র অতিরঞ্জিত করেননি; একটুও ভাবপ্রবণতার আশ্রয় কিংবা পরিমার্জনা করেননি। তাঁর সুযোগ ছিল দলবদ্ধ ধর্ষণের দৃশ্যটি সম্পাদনা করে আরও বেশি সংবেদনশীল করার। কিন্তু তা না করে অসামান্য লেখনীশক্তির প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। এককথায়, বিমানবিকীকরণকে শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন হ্যানিম্যান। ঠিক একই কাজ আমার উপন্যাসে করতে চেয়েছি। দি সিম্প্যাথাইজার-এ অনেক ভয়ানক ও পাশবিক ঘটনা আছে। আমি চেষ্টা করেছি এগুলোকে পালিশবিহীন ও চটকহীনভাবে উপস্থাপন করতে। পাঠকের চোখের সামনে কোনো বাড়তি পর্দা দিতে রাজি নই আমি। ভাবপ্রবণতা কোনো ঘটনার কোনো ভ্রূণকে নষ্ট করে দেয়।
অ্যালেক্স: এই উপন্যাসে কপটতা, দুর্নীতির চিত্র হুবহু দেখানো হয়েছে। লেখকের কোনো মন্তব্যও সংযোজিত হয়নি। যত দূর বোঝা যায়, ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি পাঠক তার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে সংযোজন করবে—এটিই লেখকের উদ্দেশ্য। কিন্তু এ-জাতীয় উপন্যাস নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সমালোচনাও হয়ে থাকে। এ নিয়ে আপনার কী মন্তব্য?
ভিয়েত থান: তা হয়ে থাকে। কিন্তু এটি ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে লেখা উপন্যাস। এতে সব পক্ষের সবাই কীভাবে ক্ষমতা ও এর অপব্যবহার, কর্তৃত্ব প্রভৃতি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে তা দেখানো হয়েছে। আমরা খারাপ কাজ করতে অভ্যস্ত—এমনটি আমরা বরাবরই মেনে নিতে নারাজ। আমাদের ধারণা, আমাদের শত্রুপক্ষই কেবল খারাপ কাজে লিপ্ত। ফলে উপন্যাসটি একটি পক্ষ নিয়েছে—ন্যায়ের পক্ষ। এই উপন্যাস তাদের গল্প, যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও বিপ্লবের নামে দিব্যি অন্যায়-অবিচার করছে। ন্যায়ের পক্ষ নিতে গিয়ে দেখা গেল এটি কোনো পক্ষকেই সমর্থন করতে পারছে না; কারণ, কোথাও ন্যায়ের ছিটেফোঁটা নেই। যুদ্ধে লিপ্ত নানা পক্ষের কাউকেই এই আখ্যান পুরোপুরি সমর্থন দিচ্ছে না। এই কারণে আমার উপন্যাসটি তীব্র সমালোচনার শিকার হতে পারে। মানুষ কেবল অপরের সমালোচনা করে, নিজেদের ভুলের কথা কারও মুখ থেকে শুনতে সে রাজি নয়। এ উপন্যাসের মাধ্যমে আমি সবার সমালোচনার সমান সুযোগ খোলা রাখলাম।
অ্যালেক্স: আপনি বলেছেন, উপন্যাসটি ন্যায়ের পক্ষ নিয়েছে। তা ছাড়া মূল গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র খুব একটা সন্দেহপ্রবণ ব্যক্তি নয়, বরং একজন অতিমাত্রায় বিশ্বাসী মানুষ।
ভিয়েত থান: কোনো সন্দেহ নেই, সে বিশ্বাসী ও একই সঙ্গে আদর্শবাদী। সাদাচোখে দেখলে সে নিশ্চয় সন্দেহপ্রবণ নয়। তবে যে পরিমাণ নৃশংসতা ও অপব্যবহারের শিকার সে হয়েছে তাতে শেষ অবধি সন্দেহপ্রবণ না হওয়া ছাড়া তার কোনো উপায় ছিল না। সে প্রতিনিয়ত সন্দেহবাদ, সংশয়বাদ ও অতিন্দ্রিয়বাদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। পরিস্থিতিই তাকে এমন হতে বাধ্য করেছে।
অ্যালেক্স: যেকোনো মূল্যে বন্ধুকে বাঁচানো মূল চরিত্রের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং এটি উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
ভিয়েত থান: বিশেষভাবে প্রাচ্যে—সবার ওপরে পরিবার ও বন্ধুবান্ধব—এমন একটি ধারণা বা বিশ্বাস প্রায় সবার মধ্যে কাজ করে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে দেখা গেছে, একই পরিবারের কিছু মানুষ এক পক্ষের হয়ে কাজ করছে, অন্যদিকে বাকিরা কাজ করছে ভিন্ন আরেকটি গোষ্ঠীর হয়ে। আবার দুই পক্ষই তাদের নিজেদের মানুষকে রক্ষার চেষ্টায় লিপ্ত। হংকংয়ের পরিচালক জন উর চলচ্চিত্রে এমনটি দেখা যায়—একই পরিবারের আপন তিন ভাই নিজেরা নিজেদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; যদিও তারা প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। আমার উপন্যাসেও প্রায় কাছাকাছি বিষয় উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি।
অ্যালেক্স: আপনি কি উপন্যাসে আত্মস্বীকারোক্তিমূলক কিছু দেখাতে চেয়েছেন?
ভিয়েত থান: যখন লেখা আরম্ভ করি উপন্যাসের পূর্ণ গঠনপ্রক্রিয়া আমার মাথায় ছিল। প্রথমেই দুই পৃষ্ঠার একটি সারাংশ তৈরি করি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গল্পটি কেমন হবে তার একটি ধারণা পাওয়ার জন্য। আমি জানতাম, গল্পটি যুদ্ধ-ক্যাম্পে শেষ হবে। কিন্তু চরিত্রদের সবার শেষ অবধি কী হবে তা জানতাম না। বইয়ের দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত আমি টেরই পাইনি যে এটি আত্মস্বীকারোক্তিমূলক হতে যাচ্ছে। হ্যাঁ, কেন্দ্রীয় চরিত্র কারও সঙ্গে কথা বলছিল। কার সঙ্গে কথা বলছিল তা জানা জরুরি ছিল না আমার জন্য। তবে সে কী কথা বলে শেষ করবে তা আগে থেকেই জানতাম। এভাবেই আত্মজীবনীমূলক অংশটি এগিয়েছে।
অ্যালেক্স: তার মানে আপনি আগে থেকেই জানতেন, সে পুরো ঘটনাটি বলতে থাকবে পুনরায়?
ভিয়েত থান: আপনি যখন কোনো উপন্যাস লিখবেন, তখন আগে থেকেই আপনার ভেবে নিতে হবে যে কে গল্প বলবে আর কারা আপনার পাঠক। আত্মস্বীকারোক্তির বিষয়টি বরাবরই একটু জটিল প্রকৃতির। কমিউনিস্ট রাজনীতিতে আত্মসমালোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধরুন, আপনি গোল হয়ে বসে আপনার কমরেডদের সামনে নিজের সমালোচনা করছেন। আমার উপন্যাসে যখন এমনটি ঘটছিল ভাবলাম, এটিই বাস্তবতা তুলে ধরার যথাযথ উপায়।
অ্যালেক্স: উপন্যাসের একটি অংশে দেখা যায়, যুদ্ধের বর্ণনা আসলে কারা দেয়! সাধারণত আমেরিকানরা, সাদা চামড়ার মানুষেরা ওই সব বর্ণনা দেয়।
.ভিয়েত থান: হলিউডের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক একটি অধ্যায় এটি। আশির দশকে হলিউড যুদ্ধের ওপর নানান ছবি বানিয়ে আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে একজন আমেরিকান তার মতো করে গল্প বলে, ইতিহাস বিকৃত করে এবং ঠিক করে দেয় গল্পের কেন্দ্রে কে থাকবে আর প্রান্তে কার অবস্থান। আমি আমেরিকান সংস্কৃতির নিজের মতো করে গল্প বানানোর ক্ষমতার কথা তো জানিই, বরং এ-ও জানি কীভাবে তারা সেসব গল্প পৃথিবীময় প্রচার করে।
আপনারা জানেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা পরাজিত হয়। কিন্তু তাদের লেখা ফিকশনের দিকে একবার তাকান, দেখবেন তারা সারা বিশ্বে যুদ্ধের গল্প নিজেদের মতো করে প্রচার করেছে। ভিয়েতনামীয়রাও যুদ্ধের গল্প বলে কিন্তু সেগুলো বিশ্বময় প্রচারের সামর্থ্য তাদের নেই। এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দিই। ফিলিপ কাপোটা নিউইয়র্ক টাইমসে আমার বইটির ওপর একটি চমৎকার আলোচনা লিখেছেন। কিন্তু লেখায় অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয় নিয়ে আমার ঘোরতর আপত্তি আছে। এক জায়গায় তিনি বলেছেন, এই উপন্যাসটি যারা বাকরুদ্ধ তাদের বাক্স্বাধীনতা দিয়েছে। আমি শ্রদ্ধাভরে বলতে চাই, ভিয়েতনামের মানুষের বাক্স্বাধীনতা আছে। হয়তো আমেরিকানরা বধির, তাই তারা শুনতে পায় না।
অ্যালেক্স: আপনি যদি কোনো আমেরিকানকে জিজ্ঞেস করেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধে কত লোক মারা গেছে তিনি কোনো চিন্তাভাবনা না করেই বলে দেবেন, ৫৮ হাজার।
ভিয়েত থান: এই যে আগপিছ চিন্তা না করে একটি সংখ্যা বলে দেওয়া—এর উদ্দেশ্য কিন্তু ভিন্ন। আমেরিকানরা কোনোভাবেই ওই যুদ্ধে তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা, ক্ষতি বা ভোগান্তির গল্পের ভৌতিক ছায়া থেকে বের হতে চায় না। আর এটিও স্বাভাবিক, যেকোনো জাতি বা সংস্কৃতির মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতার কথাই বলবে। তবে আমার মতো মানুষ যে আমেরিকান ও ভিয়েতনামীয়—দুপক্ষের অভিজ্ঞতাই নিজের ভেতরে নিয়েছে, তার জন্য কোনো একটি পক্ষকে অন্ধের মতো সমর্থন করা কঠিন।
অ্যালেক্স: এ উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে আপনাকে বহুবিধ গবেষণা করতে হয়েছে। পাঠকদের কি জানাবেন কীভাবে এমন একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র—যার মধ্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে অদ্ভুত মেলবন্ধন আছে—নির্মাণের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রেখেছেন?
ভিয়েত থান: আমি এমন একটি চরিত্র নির্মাণ করতে চেয়েছিলাম, যে জানে ‘পূর্ব পূর্বই, পশ্চিম পশ্চিমই—এই দুইয়ের মিল কখনো সম্ভব নয়।’ আর কোনো ব্যক্তি যদি জাতিতে সংকর হয় কিংবা দুটি জাতি গোষ্ঠীর সঙ্গে যার দীর্ঘদিনের ইতিহাস সম্পৃক্ত তার পক্ষে দুটি জাতির বৈষম্য ও অন্যায়ের ঘটনাগুলো নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। আমার উপন্যাসে আপনি যে কেন্দ্রীয় চরিত্রের কথা বলছেন সে একই সঙ্গে ভিয়েতনামীয় ও ফরাসি জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এ জাতীয় লোকদের শেষ পরিণতি খুব একটা ভালো হয় না। তবে তাদের মধ্যে নির্মোহতা ও নিরপেক্ষতার কোনো ঘাটতি থাকে না।
অ্যালেক্স: তার মানে আপনি ওই চরিত্রকে একটি প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন?
ভিয়েত থান: অনেকটা তা-ই। এ কারণে চরিত্রটির কোনো নাম আমি দিইনি। সে দুই জাতির পক্ষেই যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার বর্ণনাকারী এবং একই সঙ্গে দুটি সংস্কৃতির ইতিহাস-নিরীক্ষক। তা ছাড়া এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, আমেরিকানরা যাদের ‘দি আদার’ বা প্রতিস্ব হিসেবে দেখে তাদের তো নামহীন হওয়াটাই স্বাভাবিক। ফলে বেশ কিছু চরিত্রের নাম আমি দিইনি। এর একটি রূপকাশ্রয়ী উদ্দেশ্য তো আছেই।
অ্যালেক্স: উপন্যাসটির মূল চরিত্রকে নিয়ে কোনো সিক্যুয়াল করার পরিকল্পনা কি আছে আপনার?
ভিয়েত থান: আপনি ঠিকই ধরেছেন। এই গল্পে তাকে স্থিত করেছি ভিয়েতনাম ও আমেরিকায়। পরবর্তী উপন্যাস তাকে স্থাপন করার ইচ্ছে আছে ফ্রান্সে। কারণ প্রথম উপন্যাসে যা ঘটেছে তার সঙ্গে বিভিন্ন জাতির বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি সংযোগ ঘটাতে চাই আমি। সর্বোপরি দেখাতে চাই কোনো ঘটনাই বিচ্ছিন্ন নয়।
অ্যালেক্স: যুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের পাশাপাশি এটি একটি ইমিগ্রান্ট উপন্যাসও। এ বিষয়ে আপনার কী অভিমত?
.ভিয়েত থান: এই উপন্যাসের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বিভিন্ন দেশে। এই একটি কারণে একে আপনি আন্তর্জাতিক উপন্যাস বলতে পারেন। হ্যাঁ, এটি একটি ইমিগ্রান্ট বা অভিবাসীদের জীবননির্ভর উপন্যাস, শরণার্থীদের জীবনকেন্দ্রিক আখ্যান। তবে প্রচলিত অর্থে এ জাতীয় উপন্যাস যেমন হয় এটি তা থেকে অনেকটাই ভিন্ন। সাধারণত গতানুগতিক আমেরিকান শরণার্থীদের জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাসে দেখা যায়, শরণার্থীরা পালিয়ে আমেরিকায় আসে, নানা সমস্যার ভেতর দিয়ে জীবন কাটায়। একপর্যায়ে তারা আমেরিকান হয়ে যায়। আমেরিকা তখন বলে, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত এলাকা থেকে শরণার্থীদের তুলে এনে তাদের জীবন বাঁচিয়েছে, তাদের দিয়েছে নতুন জীবনের সন্ধান। আমার প্রশ্ন—যুদ্ধটা কে বাধিয়েছে? যা হোক, আমার গল্পের মূল চরিত্র সবশেষে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফিরে যায় এবং উপন্যাসের শেষও হয় সেখানেই। কারণ আমি বোঝাতে চেয়েছি, ‘আমেরিকান ড্রিম’ বা আমেরিকান স্বপ্ন আর শরণার্থী বা ইমিগ্রান্টদের স্বপ্ন এক নয়।
অ্যালেক্স: দি সিম্প্যাথাইজার-এর ঘটনার সঙ্গে বিশ্বের চলমান যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশগুলোর কোনো সাযুজ্য কি খুঁজে পাওয়া যাবে?
ভিয়েত থান: অবশ্যই। এ বইটি পড়লে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গে ইরাক, আফগানিস্তানে বর্তমানে যা যা হচ্ছে সেসবের মিল পাওয়া যাবে। শেষ করতে চাই এই বলে, আমেরিকানরা মনের মতো গল্প তৈরি করে তুলে ধরছে, কেন বিভিন্ন জায়গায় তারা যুদ্ধ করছে এবং কীভাবে তারা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করছে। আমেরিকানরা যুদ্ধ-কেন্দ্রিক ন্যারাটিভ বা ফিকশনগুলোতে দেখাচ্ছে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত অঞ্চলগুলো থেকে আসা মানুষদের তারা নতুন জীবনের নিশ্চয়তা দিচ্ছে।
ভিয়েত থান ন্গুয়েন ও ‘দি সিম্প্যাথাইজার’
ভিয়েন থান ন্গুয়েনের জন্ম ১৯৭৫ সালে, ভিয়েতনামে। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় পুরো পরিবারসহ শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়াতে ইংরেজি ও আমেরিকান অধ্যয়ন বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন। ২০১৫ সালে প্রকাশিত দি সিম্প্যাথাইজার তাঁর প্রথম উপন্যাস। ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং ওই যুদ্ধে ভুক্তভোগী মানুষই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য।

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন