কোচিং বন্ধে নীতিমালা বৈধ : রিট মামলার শুনানিতে হাইকোর্ট

হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিবাজ ছেড়ে দুর্বলদের নিয়ে ব্যস্ত দুদক

প্রকাশিত: ০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ১০:৫০:৩৫

ব্যাংকিং খাতের লুটপাটকারী হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়ালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে স্কুলশিক্ষকদের দুর্নীতি অনুসন্ধান নিয়ে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করায় দুদকের কর্মকান্ডের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হচ্ছে। অথচ দুদক শিক্ষকদের (দুর্বল) নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোচিং সেন্টার সংক্রান্ত নীতিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা রিট আবেদনের শুনানিকালে গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন। মামলার শুনানিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবীকে উদ্দেশ করে আদালত বলেন, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বড় বড় রাঘববোয়ালদের ধরে এনে ছেড়ে দিয়ে শুধুমাত্র স্কুলশিক্ষকদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে দুদক।

 যেখানে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে, সেখানে প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকরা স্কুলে যাচ্ছেন কী যাচ্ছেন না দুদক তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর আগে পাটকল শ্রমিক জাহালমের তিন বছর কারাবাসের ঘটনায় দুদকের কর্মকান্ডের কড়া সমালোচনা করে হাইকোর্টের অপর একটি বেঞ্চ বলেন, দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করুক এটা আমরাও চাই। আরো স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার পরার্মশ দেন। এর আগে গত বছর বেসিক ব্যাংকের মামলা শুনানিকালে দুদকে পিক এন্ড চুজ না করার কথা বলেন উচ্চ আদালত। আদালতে রিটকারীদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর ও নাসিরুদ্দিন।

 দুদকের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন এ মামলার অ্যামিকাস কিউরি অ্যাডভোকেট ফিদা এম কামাল। রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মোখলেসুর রহমান। দুদক দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না উল্লেখ করে আদালত বলেন, ছোট দুর্নীতির আগে বড় বড় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। তবেই দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব হবে। কোচিং বাণিজ্য বন্ধে করা সরকারের নীতিমালা বৈধ ঘোষণা করে রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়, সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা কোচিং করাতে পারবেন না। পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, কোচিং বাণিজ্য অনুসন্ধান এবং তদন্ত করার এখতিয়ার দুদকের আছে।

 তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি অগ্রাধিকার তালিকা থাকতে হবে, কোন বিষয়ে কমিশন তদন্ত বা অনুসন্ধান করবে। কেননা দুদকের পর্যাপ্ত জনবল সঙ্কট রয়েছে। কাস্টমস হাউজ, ব্যাংক, বন্দর, ভূমি অফিসের দুর্নীতির বিষয়ে ছোটো পরিসরে তদন্ত বা অনুসন্ধানে সুযোগ নেই দুদকের। এসব খাতে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অগ্রাধিকারভিত্তিতে এ ধরনের অভিযোগে নজর দিতে হবে। শুনানিতে দুদকের উদ্দেশ্য করে হাইকোর্ট বলেন, কোচিং বাণিজ্য নিয়ে সরকারি স্কুলে দুদক অভিযান চালাতে পারেন; কিন্তু বেসরকারি স্কুলে অভিযান চালাতেও বাধা নেই। কিন্তু দুদক এর চেয়ে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।

 যদিও এইসব কাজ কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। কাজেই দুদককে অর্থ খাত তথা ব্যাংক খাত, কাস্টমস ল্যান্ড, ভূমি ও সেবা খাতকে আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কোচিং বাণিজ্য নিয়ে হাইকোর্ট বলেন, কোচিং বাণিজ্য কারা করে তা সবাই জানে, কিন্তু ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে, সেখানে দুদক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ক্লাসে আসছে কিনা তা নজরদারি করছে। হাইকোর্ট বলেন, দুদক সম্পর্কে জনসাধারণের সাধারণ ধারণা জন্মেছে যে, দুদক দুর্বলদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও সমাজের রাঘববোয়ালদের বিরেুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। বড় বড় রাঘববোয়াল ধরে এনে ছেড়ে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না দুদক।

 ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে, সেখানে দুদক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ক্লাসে আসছে কিনা তা নজরদারি করছে। এ বিষয়ে জানতে চাইল দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান ইনকিলাবকে বলেন, দুদককে ব্যাংক খাত, কাস্টমস ল্যান্ড, ভূমি ও সেবা খাতকে আরো বেশি গুরুত্ব দিতে বলেছেন আদালত। গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে নজর দিতে বলেছেন। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, দুদক দুর্বলদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও সমাজের রাঘববোয়ালদের বিরেুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। অগ্রাধিকারভিত্তিতে কাজ করার কথাও বলেছেন। তিনি আরো বলেন, কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সরকারি নীতিমালা বৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন।

সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কোচিং নিষিদ্ধ :
স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যে বন্ধে ২০১২ সালে প্রণীত সরকারের নীতিমালা বৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। ফলে সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা কোচিং করাতে পারবেন না। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেসুর রহমান জানান, যেহেতু কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সরকারের নীতিমালা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে সে কারণে ক্লাসে পাঠদানের বাইরে মাসে ১৭৩ টাকা করে যে অতিরিক্ত ক্লাস নেয়ার বিধান করা হয়েছে তার বাইরে কোনো কোচিং করানো যাবে না। এর আগে কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হবে না সে জন্য সরকার গত বছর কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এ নোটিশ দেয় সরকার।

 এসব নোটিশ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা-২০১২ নিয়ে শিক্ষকরা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই চিঠির কার্যকারিতা চার মাসের জন্য স্থগিত করার পাশাপাশি রুল জারি করেন আদালত। ওই আদেশের বিরুদ্ধে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করার অনুমতি চেয়ে লিভ টু আপিল দায়ের করেন। গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ওই আবেদনের ওপর শুনানি শেষে গত ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে হাইকোর্ট বেঞ্চকে এ রুলের নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। পরে আদালত এ রুল নিষ্পত্তির জন্য সাবেক দুই অ্যাটর্নি জেনারেল হাসান আরিফ ও ফিদা এম কামালকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেন। পরে গত ২৭ জানুয়ারি চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য এদিন ধার্য করেন।

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন