পরিষ্কার বলছি আমরা শপথ নিচ্ছি না : বিএনপি

২৯৯ আসনে মামলা করবেন প্রার্থীরা

প্রকাশিত: ০৪ জানুয়ারী, ২০১৯ ১০:৪২:২৮

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট চুরির অভিযোগ এনে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই নির্বাচনে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের ৭জন প্রার্থী নির্বাচিত হলেও তারা এমপি হিসেবে শপথ নেবেন না বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, শপথ তো পার হয়ে গেছে, প্রত্যাখ্যান করলে শপথ থাকে নাকি আর? আমরা শপথ নিচ্ছি না, পরিস্কার করে বললাম।

গতকাল (বৃহস্পতিবার) দুপুরে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠক শেষে তিনি এসব কথা বলেন। নির্বাচনে ভোট চুরি, কারচুপি, জালিয়াতির অভিযোগ করা বিএনপি পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা প্রার্থীদের ঢাকায় ডাকা হয়। তাদেরকে নিয়ে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় জরুরি বৈঠক শুরু হয় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে।

এক ঘণ্টার ওই বৈঠকে বিএনপি থেকে নির্বাচিত পাঁচজনসহ মোট ১৭৮ জন অংশ নেন। তবে গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দুজন বৈঠকে ছিলেন না। বৈঠকে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি প্রদান ছাড়াও নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ২৯৯টি আসনেই মামলা করার বিষয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কি করা যায় সে বিষয়েও আলোচনা হয়। বৈঠকের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে রওনা হন স্মারকলিপি দিতে।

সারাদেশে নির্বাচনের দিন অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগ এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে পুনঃনির্বাচনের দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি নিয়ে বিকালে নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এছাড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সব প্রার্থী আলাদাভাবে নির্বাচনের অনিয়ম ও কারচুপির বিষয়ে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করবেন বলে জানান তিনি। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি, মামলা, গ্রেফতার, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস, প্রার্থীদের আটক ও প্রার্থিতা বাতিল বিষয়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে এলাকাভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে বিএনপির হাইকমান্ড।

সেগুলো যাচাই-বাছাই করে অভিযোগ আকারে দেয়া হবে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন বাতিলের দাবিতে মামলায়, বিভিন্ন দফতরে এবং বিদেশি ক‚টনীতিকদেরও কাছে। বিদেশি ক‚টনীতিকদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়কে বলা হবে যে, আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো সুষ্ঠু ভোট হওয়া সম্ভব নয়। তাই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি সুষ্ঠু ভোটের দাবি জানাবে বিএনপি ও শরিকরা। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা জানান, ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে প্রতিকার চাইবেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা।

প্রত্যেক আসন থেকে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করবেন। এর আগে সংশ্লিষ্ট আসনের রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ জানানো হবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা বলেন, আমি মামলা করবো। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছেও অভিযোগ জানাবো। আমি চাইবো যে সব প্রার্থীই তার আসনভিত্তিক অভিযোগ করবেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির একজন সদস্য জানান, আসন ধরে নির্বাচনি ট্রাব্যুনালে মামলা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

এখন চেষ্টা করা হচ্ছে এই উদ্যোগের সঙ্গে মহাজোটের বাইরে থাকা অন্যান্য দলকেও যুক্ত করার। যেসব রাজনৈতিক দল বা জোট ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফলাফর প্রত্যাখ্যান করেছে তাদেরকে সাথে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের কথাও চিন্তা করছে রাজপথের এই বিরোধী জোট। এজন্য ইতোমধ্যে বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিকদের সাথে আলোচনার জন্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের সাথে কথা বলার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডির আ স ম আবদুর রবকে।

নির্বাচন বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী, নির্বাচিত প্রার্থীর নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হওয়ার পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যে সংক্ষুব্ধ পক্ষ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে নির্বাচন সংক্রান্ত অভিযোগের দরখাস্ত করতে পারবে। সেক্ষেত্রে বুধবার গেজেট প্রকাশ হওয়ায় এখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বা ২০ দলীয় জোটের প্রার্থীরা মামলা করতে পারবেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার বিধানও রাখা হয়েছে।

বৈঠকে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি এনপিপির চেয়ারম্যান ও নড়াইল-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, ভোটে অনিয়ম ও কারচুপির প্রমাণ, প্রতিটি কেন্দ্রের অস্বাভাবিক ভোটের হিসাব, গ্রেফতার হওয়া এজেন্ট ও নেতাকর্মীদের তালিকা, সহিংসতায় আহত ও নিহতদের তালিকাসহ আটটি বিষয়ের তথ্য নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কাছে তারা জমা দিয়েছেন। এছাড়া বৈঠকে সকল প্রার্থীদের মামলার করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে আবারও সকলকে এসে করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির একজন সদস্য জানান, আপাতত আইনি লড়াই চালানো হবে। ইতোমধ্যে ঐক্যফ্রন্টের শুভানুধ্যায়ী মহল থেকেও এ পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ২০ দলীয় জোটের নেতা ও খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের বলেন, নির্বাচনই হয়নি। এখন মামলায় কী হবে। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র মিলে এই নির্বাচন করেছে। তবুও সবাই সিদ্ধান্ত নিলেও আমরাও মামলায় যাবো। সারা দেশে তিনশ আসনের মধ্যে এবার ২৯৮ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি। এছাড়া চট্টগ্রাম-১৪ আসনে ২০ দলীয় জোটের শরিক এলডিপির অলি আহমেদ নিজের দলের প্রতীক ‘ছাতা’ এবং কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর হামিদুর রহমান আযাদ স্বতন্ত্র হিসেবে ভোট করেন।

বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে বগুড়া-৬ আসনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বগুড়া-৪ আসনে মোশাররফ হোসেন, ঠাকুরগাঁও-৩ আসেন জাহিদুর রহমান, চাঁপাই নবাবগঞ্জ-২ আসনে আমিনুল ইসলাম ও চাঁপাই নবাবগঞ্জ-২ আসেন হারুনুর রশীদ জয়ী হন। আর গণফোরামের প্রার্থীদের মধ্যে সিলেট- ২ আসনে মোকাব্বির খান ও মৌলভীবাজার-২ আসনে সুলতান মো. মনসুর জয় পান। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান, স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপি ছাড়াও জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, খেলাফত মজলিশ, এনপিপি, লেবার পার্টির প্রার্থীরা থাকলেও জামায়াত ইসলামীর কেউ ছিলেন না। ধানের শীষের প্রার্থীদের মধ্যে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, হাফিজউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, জয়নাল আবেদীন, নিতাই রায় চৌধুরী, শাহজাহান ওমর, মিজানুর রহমান মিনু, আমিনুল হক, আবদুস সালাম, শাহজাহান মিয়া, ভিপি জয়নাল আবেদীন, হারুনুর রশীদ, আসাদুল হাবিব দুলু, আনোয়ারুল আজীম;

শামা ওবায়েদ, জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, গৌতম চক্রবর্তী, আলমগীর কবির, দেওয়ান মো. সালাহউদ্দিন, নাজিম উদ্দিন আলম, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী, সুলতান মাহমুদ বাবু, রফিকুল ইসলাম হিলালী, শরীফুল আলম, জালাল উদ্দিন, আজিজুল বারী হেলাল, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, জিএম সিরাজ, সাখাওয়াত হোসেন বকুল, জহিরউদ্দিন স্বপন, মফিকুল হাসান তৃপ্তি, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জাহিদুর রহমান, অরুণ মেহেদি, সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিকী সাজু, নবী উল্লাহ নবী, মোরশেদ মিল্টন, পারভেজ আরেফীন সিদ্দিকী, শিরিন সুলতানা, রুমানা মাহমুদ, আমিরুল ইসলাম খান আলিম, সেলিম রেজা হাবিব, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, সৈয়দ মেহেদি আহমেদ রুমি;

সৈয়দ ফয়সল আহমেদ চৌধুরী, মিজানুর রহমান, জি কে গউছ, আবু তাদের তালুকদার, কায়সার কামাল, আনোয়ারুল হক, তাহসিনা রুশদি লুনা, লুৎফর রহমান কাজল, মুন্সি রফিকুল আলম, খন্দকার মুক্তাদির, মোশাররফ হোসেন, শফি আহমেদ চৌধুরী, এবিএম মোশাররফ হোসেন, আসাদুজ্জামান, শাহ রিয়াজুল ইসলাম, একরামুজ্জামান, আবু সুফিয়ান, মিল্টন বৈদ্য, আনিসুর রহমান খোকন, শাহ আবু জাফর, খোন্দকার আখতার হামিদ ডাবলু, মো. মোশাররফ হোসেন, মো. আলী সরকার, তাজভীরুল ইসলাম, টিএস আইয়ুব, সাইফুর রহমান রানা;

মো. হানিফ, আনোয়ারুল ইসলাম, আলী নেওয়াজ খৈয়াম, এমদাদুল হক ভরসা, সাহাদাত হেসেন, মাসুদা মোমিন, সালমা আলম, রফিকুল ইসলাম, সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, সালাহ উদ্দিন সরকার, কাজী নাজমুল হোসেন, শাহ শহীদ সারোয়ার, আবদুল খালেক, মজিবুল হক, মো. ইউনুস, ফাহিম চৌধুরী, শামীম আরা বেগম, আহসান উল্লাহ হাসান, নসরুল হক সাবু, ওয়ারেস আলী মামুন, আজহারুল ইসলাম মান্নান, লায়ন হারুনুর রশীদ, আমিনুল ইসলাম, মনি স্বপন দেওয়ান, কনক চাঁপা, সাচিং প্র, ফরহাদ হোসেন আজাদ, ফজলুর রহমান, আবু ওহাব আখন্দ;

মাহমুদুল হক রুবেল, এম নাসের রহমান, আবুল খায়ের ভূইয়া, আশরাফ উদ্দিন বকুল ও লুৎফর রহমান খান আজাদ উপস্থিত ছিলেন বৈঠকে। শরিকদের মধ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির আ স ম আবদুর রব, আবদুল মালেক রতন, শহীদউদ্দিন মাহমুদ, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কাদের সিদ্দিকী, ইকবাল সিদ্দিকী, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, মোস্তফা মহসিন মন্টু, আমসা আমিন, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, খেলাফত মজলিশের আহমেদ আবদুল কাদের, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এনডিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বৈঠকে অংশ নেন।

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন