সত্তরে চারুকলা

উৎসবমুখর দিনগুলো

প্রকাশিত: ০২ জানুয়ারী, ২০১৯ ১২:৫২:৪২

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ১৯৪৮ সালে বাংলাদেশে যে আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, কালক্রমে সেটিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ।২৫ ডিসেম্বর ছিল দেশের প্রাতিষ্ঠানিক চারুকলা-চর্চার এই পীঠস্থানের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। অন্যদিকে শিল্পাচার্যের জন্মদিন ছিল ২৯ ডিসেম্বর।এবার দুটো উপলক্ষ একসঙ্গে উদ্যাপন করতে মাসজুড়েই চারুকলায় ছিল নানা আয়োজন।সেই গল্প শোনাচ্ছেন জাকির উসমান।

কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৪৮ সালে ঢাকায় চিত্রকলা শেখার একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নেন কয়েকজন শিল্পী।এ দলে ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান, খাজা শফিক আহমেদ, শফিউদ্দিন আহমেদ, আনোয়ারুল হক, শফিকুল আমিন প্রমুখ।শুরুতে অধ্যক্ষ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনসহ শিক্ষক ছিলেন ছয়জন।

ফাইন আর্টস, কমার্শিয়াল আর্টস ও গ্রাফিক আর্টস—এই তিন বিভাগে মোট ছাত্র ছিলেন আঠারোজন।পুরান ঢাকার জংশন রোডে ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলের একটি বিল্ডিংয়ে যাত্রা শুরু এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের।প্রতিষ্ঠাকালে নাম ছিল ‘গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট।১৯৫২ সালে ইনস্টিটিউটটি সেগুনবাগিচার একটি বিল্ডিংয়ে স্থানান্তরিত হয়।

এরপর ১৯৫৬ সালে শাহবাগে নিজস্ব ভবনে এসে এটি শুরু করে শিল্পশিক্ষা কার্যক্রম।এই প্রতিষ্ঠান প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হয় ১৯৬৩ সালে।তখন নাম বদলে রাখা হয় ‘বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়। এটিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীভুক্ত করা হয় ১৯৮৩ সালে।বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে এনে আরেকবার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘চারুকলা ইনস্টিটিউট। পরবর্তীকালে এটি অনুষদের মর্যাদা লাভ করে।

চারুকলায় এখন আটটি বিভাগ রয়েছে—অঙ্কন ও চিত্রায়ণ, ছাপচিত্র, ভাস্কর্য, কারুশিল্প, গ্রাফিক ডিজাইন, প্রাচ্যকলা, মৃিশল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস।১৯৭৮ সাল থেকে এখানে শুরু হয় এমএফএ কোর্স।শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগ এমএফএ কোর্স চালু করে ১৯৯১ সালে এবং সম্মান কোর্স ২০০১ সালে। অন্যান্য বিভাগ সম্মান কোর্স চালু করে ১৯৯২-১৯৯৩ সেশন থেকে। চারুকলা ভবনের নকশা করেন খ্যাতিমান স্থপতি মাজহারুল ইসলাম।

এ বছর ‘জয়নুল উত্সব ২০১৮’ ও ‘চারুকলার ৭০ বছর পূর্তি’উপলক্ষে অনুষ্ঠান ছিল দুটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে ১০ থেকে ২০ ডিসেম্বর ‘প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষক-শিল্পীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শনী’অনুষ্ঠিত হয়েছে। গ্যালারির দুটি কক্ষে ছিল এ আয়োজন।অংশ নেন ১০৭ জন শিল্পী।এতে জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দীন আহমেদ, কামরুল হাসান,

শফিকুল আমিন, আনোয়ারুল হক, কাইয়ুম চৌধুরী, মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পকর্ম যেমন ছিল, সঙ্গে দেখা গেল রফিকুন নবী, হাশেম খান, মনিরুল ইসলাম, শিশির ভট্টাচার্য্য থেকে বর্তমান সময়ের সীমা ইসলাম, সুমন কুমার বৈদ্য প্রমুখের কাজও।প্রদর্শিত হলো ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম ও দৃশ্যশিল্পসহ নানা রকম শিল্পকর্ম।আর বার্ষিক প্রদর্শনীতে বিভিন্ন বিভাগের পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী চলেছে ২৩ থেকে ২৯ ডিসেম্বর।

এ ছাড়া ছিল শোভাযাত্রা।ছিল চারুকলা প্রাঙ্গণজুড়ে কারুশিল্প মেলায় শিল্পকর্ম বিক্রয় ও প্রদর্শনীর আয়োজন।চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের প্রভাষক বিশ্বজিত্ গোস্বামী জানান, প্রতিবছর শিল্পাচার্যের জন্মদিনে বার্ষিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।নিয়মিত এই আয়োজন ১৯৮৮ সাল থেকে শুরু হলেও বড় পরিসরে করা হচ্ছে ২০০৯ সাল থেকে।

এবারের আয়োজন সম্পর্কে তিনি জানান, ২৫ ডিসেম্বর অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আমরা নবীন-প্রবীণ শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী করেছি।দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বহু প্রাক্তন শিক্ষার্থী এসেছিলেন।চারুকলা প্রাঙ্গন ভরে উঠেছিল তাঁদের পদচারণে।একসঙ্গে এত শিল্পী, এত শিক্ষার্থীর সমাবেশ চারুকলায় কমই দেখা গেছে।এ ছাড়া চারুকলা প্রাঙ্গণে ছিল চারু ও কারুশিল্পের বিক্রয় ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা।

এই মেলায় ৮টি বিভাগের শিক্ষার্থীরা যেমন অংশ নিয়েছেন, তেমনি দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা কারুশিল্পীরাও তাঁদের শিল্পকর্ম বিক্রয় ও প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছেন। মেলায় ঠাঁই পেয়েছে শাঁখারিবাজারের শঙ্খশিল্প, রংপুরের শতরঞ্জি, যশোরের নকশিকাঁথা, ঝিনাইদহের শোলাশিল্প, ধামরাইয়ের ধাতবশিল্প, মৌলভীবাজারের শীতলপাটি, রাজশাহীর শখের হাঁড়ি ও সোনারগাঁয়ের কাঠের পুতুলের স্টল।

১৯৪৮ থেকে ২০১৮—এই সত্তর বছরে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক চারুচর্চা সম্পর্কে মূল্যায়নে তিনি জানান, ‘জয়নুল আবেদিন যে প্রতিকূল পরিবেশে এই প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেছিলেন, তা নিঃসন্দেহে একটি বিপ্লব।এই সত্তর বছরে আমাদের চারুকলা বহু দূর এগিয়েছে।নিশ্চয়ই আরো এগোবে। প্রযুক্তিগত সুবিধা আমাদের এখন আরো দ্রুতগামী ও গতিশীল করেছে।সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতির সঙ্গে শিল্পের একটি নিবিড় যোগ রয়েছে।

একটি ভালো সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য শিল্পচর্চা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এই সত্তর বছর ধরে দেশ-কালের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই ভূমিকাই রেখে চলেছেন চারুকলার শিল্পীরা।চারুকলার ৭০ বছর পূর্তি ও ‘জয়নুল উত্সব ২০১৮র সমন্বিত অনুষ্ঠানমালার শেষ দিন ছিল ২৯ ডিসেম্বর। সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে জয়নুলের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়।

চারুকলার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও সর্বস্তরের মানুষ এতে অংশ নেন। বকুলতলায় গানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘জয়নুল উত্সব ২০১৮’র মূল আয়োজন।এদিন ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সম্মাননা পদক দেওয়া হয় লন্ডন স্লেড স্কুল অব ফাইন আর্টের পরিচালক অধ্যাপক ড. সুশান কলিন্স ও বরেণ্য চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলামকে।অনুষ্ঠানে আসা কলাকেন্দ্র নামের একটি প্রতিষ্ঠানের আর্টিস্ট ও কিউরেটর ওয়াকিলুর রহমানের সঙ্গে কথা হয়।

তিনি বলেন, আটচল্লিশের আগে প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক—কোনোভাবেই আমাদের চারুচর্চার কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না।একটা বৈরী সময়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে জয়নুল যে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেটি একটি ইতিহাস।জয়নুলের সঙ্গে আরো যাঁরা ছিলেন তাঁরা বুঝেছিলেন, মানুষের সত্যিকার মুক্তি এবং মনুষ্যত্ববোধ ও সুকুমারবৃত্তি জাগিয়ে তোলার জন্য শিল্পচর্চার বিকল্প নেই।

অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আশিকুল ইসলাম রাহাত মনে করেন, ‘বাংলাদেশের চারু ও কারুশিল্প পাঠদান ও চর্চার প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চারুকলা অনুষদ।এ দেশের প্রেক্ষাপটে সত্তরটি বছর পার করা বড় ঘটনা।তবে এখনো আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। ঔপনিবেশিকতার যে বৃত্ত এখনো চারপাশে সেঁটে আছে, সেটি ভাঙা ও অতিক্রম করা দরকার।

তিনি আরো বলেন, পরিবারের রক্ষণশীলতার কারণে এখনো অনেক ছেলেমেয়ে শিল্পচর্চায় এগিয়ে আসতে পারেন না। আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই অনেকের গল্প আমরা জানি—কী প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে তাঁরা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।সমাজের অনেক ক্ষেত্রেই এখনো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সেভাবে হয়নি।ঔপনিবেশিক মনোবৃত্তি ও রক্ষণশীলতার পরিবর্তন হলে এ দেশে চারুচর্চা আরো এগিয়ে যাবে।এবারের উত্সব আমাদের সেই প্রেরণাই দিয়েছে।

প্রজন্মনিউজ২৪/ওসমান

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন