আমরা মওলানা ভাসানী বলি

প্রকাশিত: ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৬:৫০:০২

মো.হামিদুর রহমান, স্টাফ রিপোর্টার:  ‘তোমাদের কি হল যে তোমরা সংগ্রাম করছ না আল্লাহর পথে, অসহায় নরনারী ও শিশুদের জন্যে ? ওরা বলে, হে আমাদের রব! এই জালিম অধিবাসীদের জনপদ থেকে আমাদের অন্য কোথাও নিয়ে যাও, তোমার তরফ থেকে কাউকে আমাদের অভিভাবক করে দাও, তোমার তরফ থেকে কাউকে আমাদের সহায় করে দাও।’ (৭৫, সূরা নেসা)

এই আয়াতের ওসিলা ধরেই ভারতবর্ষে সেদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য জন্মেছিলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (র), শাহ আবদুল আজিজ (র), শাহ আহমদ বেরেলভি (র), সৈয়দ নিসার আলী তিতুমির (র), হাজী শরীয়তউল্লাহ, মহসিনউদ্দিন আহমদ, শায়েখ ইমদাদউল্লাহ, মাওলানা কাসেম নানুতুবি, মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (র) প্রমুখ। তারা নেতৃত্ব দিয়েছেন দারুল হরব-আন্দোলনের, ফরায়জি আন্দোলনের, চাপাতি আন্দোলনের, প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের, সিত্তানার সশস্ত্র বিদ্রোহের, দেওবন্দ আন্দোলনের, দারুল আমানের ভিত্তিতে শিক্ষা আন্দোলনের, সিরাজগঞ্জের কৃষক বিদ্রোহের।

এই আবহে এবং তাদের উত্তরাধিকারসূত্রে জন্ম নেন আরও একজন ‘অভিভাবক’- আবদুল হামিদ খাঁ। মওলানা ভাসানীর ১৯৭৩ সালের সর্বশেষ পাসপোর্ট অনুযায়ী তার জন্ম ১২ ডিসেম্বর, ১৮৮০ খৃস্টাব্দে। জন্মস্থান সিরাজগঞ্জের সয়া-ধানগড়া গ্রামে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পরিবারে। পিতার নাম হাজী শরাফত আলী খাঁ (মৃত্যু-১৮৮৬), মাতার নাম মজিরন বিবি (মৃত্যু-১৮৯১)। পিতা-মাতা আর তিন ভাই-এক বোনের সংসার। খেলুড়ে, ডানপিঠে আবদুল হামিদের ডাকনাম হলো বিষাক্ত এবং ছটফটে এক মাছের নামে-চ্যাকা। খুব প্রচলিত কথা- মওলানা ভাসানীর জন্ম ‘দরিদ্র কৃষক’ পরিবারে।

কার্ল মার্ক্স নিজে শ্রমিক ছিলেন না, কিন্তু শ্রমিকদের মুক্তির পথ-প্রদর্শক ছিলেন। তেমনি মওলানা ভাসানীও কৃষক পরিবারে জন্ম নেননি, কিন্তু কৃষক-আন্দোলনের জন্ম দিয়েছেন। স্টিমার ঘাট থাকার কারণে সিরাজগঞ্জ তখন গুরুত্বপূর্ণ শহর। সে শহরে তার পিতার ছিল জুতার দোকান। মওলানার পিতা এবং চাচার ৭ বিঘা জমি ছিল। তাছাড়া সে সময় হজ করতে প্রয়োজন হতো ৮০-১০০ টাকা (স্বর্ণের ভরি ছিল ২৮ টাকা) এবং তিনি নিজ খরচেই হজ সম্পন্ন করেছিলেন। অর্থাৎ তারা স্বল্পবিত্তের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী একটি পরিবার ছিলেন। ব্যবসার প্রয়োজনে হাজী সাহেবকে মাঝেমাঝে কলকাতা যেতে হতো।

সেখানে তার বন্ধুত্ব হয় সূফি সাধক সৈয়দ নাসিরউদ্দিন আহমদ বোগদাদি (র.)’র সাথে। তিনি ছিলেন হেকিম এবং সমাজসেবী। বিভিন্ন এলাকায় দাতব্য চিকিৎসালয়, ইন্দারা আর মুসাফিরখানা স্থাপন করে সৃষ্টির সেবা করতেন। হাজী সাহেব তার বন্ধুকে নিজ জেলায় আমন্ত্রণ জানান। উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি সেদিন যাব যেদিন আপনি বলবেন সিরাজগঞ্জের কোনো বাসায় শকুন বাসা বেঁধেছে!’ আসলে তৎকালীন প্রচলিত কুসংস্কার ছিল কোনো বাড়িতে শকুন বাসা বাঁধলে সেই বাড়িতে বসবাসরত পরিবার নির্বংশ হয়ে যাবে। ফলে ভয়ে সবাই বাড়ি ছেড়ে পালাত।

সৈয়দ নাসিরউদ্দিন আহমদ (র.) সেই সব বাড়ি মালিকের কাছ থেকে নিয়ে সেখানে চিকিৎসালয় বা মুসাফিরখানা প্রতিষ্ঠা করতেন। হাজী সাহেব খোঁজ করতে করতে সত্যিই এমন একটি বাড়ি পেলেন হোসেনপুরে, এক সুদখোর মহাজনের বাড়ি, খালি হয়ে গেছে শকুন বাসা বাধার কারণে। এই বাড়ি জনকল্যাণে কাজে লাগাতে সিরাজগঞ্জে পা রাখেন সৈয়দ নাসিরউদ্দিন আহমদ (র.)। এখানে এসে তার চোখে পড়ল শিশু আবদুল হামিদ খাঁকে। বুজুর্গ সৈয়দ নাসিরউদ্দিন আহমদ (র.) তার বন্ধুর কাছে বললেন, ‘বন্ধু, আপনার ছেলেটাকে আমাকে দেন।’ খুশিমনে বন্ধু রাজি হলেন। কথা দেওয়া-নেওয়া হলো, আবদুল হামিদ খাঁ সাবালক হলে এই সুফির দরবার হবে তার ঠিকানা।

সৈয়দ নাসিরউদ্দিন আহমদ (র.) সিরাজগঞ্জ থেকে ফিরে গেলেন। হাজী সাহেব সম্ভবত ৪৫/৪৬ বছর বয়সেই মারা যান। মহামারী কলেরা শিশু আবদুল হামিদের কাছ থেকে কেড়ে নেয় মা, দুই ভাই, একটি বোনকে। চাচার কাছে বড় হতে থাকেন তিনি। প্রচলিত আছে, তিনি যখন খেয়াল করেন যে তার চাচা সামজের বিত্তশালীদের আদরে আপ্যায়নে দাওয়াত খাওয়ান কিন্তু নিম্নবিত্তদের আলাদা খাওয়ান তখন চাচার সাথে তার বাক-বিতণ্ডা হয়। রাগ করে তিনি চলে যান এক বোনের শ্বশুরবাড়ি। অনুসারীদের কাছে স্মৃতিচারণ করার সময় মওলানা বলেছেন, কিছুদিন পর তার সে বোন তার হাতে এক আধুলি দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভাইরে, দুই চোখ যেদিকে যায় চলে যা।’

এ দিকে সৈয়দ নাসিরউদ্দিন আহমদ (র.)’র কাছে খবর পৌঁছায়, যে ছেলেটির অভিভাবকত্ব তিনি নিতে চেয়েছেন সে আজ এতিম শিশু। তিনি আসলেন সিরাজগঞ্জ কিন্তু দুরন্ত চ্যাকা মিয়া ততদিনে উধাও। চারিদিকে পড়ল খোঁজ আর খোঁজ। অবশেষে কিশোর আবদুল হামিদ খাঁ’কে পাওয়া গেল কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে, একটি গানের দলে। ১৮৯৭ সাল থেকে সৈয়দ নাসিরউদ্দিন আহমদ (র.) শিষ্য আবদুল হামিদ খাঁসহ আসামের ধুবরি মহকুমার জলেশ্বর গ্রামে বসবাস করতে থাকেন। ১৮৯৭ থেকে ১৯০৭, দীর্ঘ ১০টি বছর নিজের সান্নিধ্যে রেখে তিনি তার শিষ্যটিকে বিভিন্নমুখী শিক্ষা দান করেন, যার মধ্যে ছিল উৎপাদনশীল জীবনযাপনের জন্য কঠোর পরিশ্রমী ও দুঃসাহসী হওয়ার শিক্ষা;

ভাষা শিক্ষার মধ্যে অন্যতম ছিল আরবি, ফার্সি, উর্দু, হিন্দি, বাংলা ও ইংরেজি; এছাড়া পড়িয়েছেন দর্শনতত্ত্ব, তর্কশাস্ত্র, রসায়ন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাবিদ্যা এবং আধ্যাত্মবিদ্যা। ১৯০৭ সালে তিনি তরুণ আবদুল হামিদকে পাঠান উত্তর ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে, তবে প্রথামাফিক ছাত্র হিসেবে ভর্তি করাননি। দেওবন্দের দুজন প্রখ্যাত শিক্ষক এবং বিপ্লবী নেতা সৈয়দ হোসেইন আহমদ মাদানী এবং শায়খুল হিন্দ মওলানা মাহমুদুল হাসান-এর কাছে পাঠিয়েছিলেন ব্যাক্তিগত ভাবে তার শিষ্যকে রাজনীতি, অর্থনীতি ও মানবসভ্যতা শিখাতে, জানাতে ও বুঝাতে।

একারণে দেওবন্দের কোনো সার্টিফিকেটও নেই তার, আছে রবুবিয়াত এবং ফুক্কা কুল্লে নেজামিনের শিক্ষার পাঠ যা ছিল তার রাজনীতির মূল আদর্শ। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মওলানা ভাসানী নিজেকে বহুবার একা করে ফেলেছেন বটে কিন্তু কখনো থেমে থাকেননি। স্রষ্টা এবং সৃষ্টির সেবায় নিজেকে যেমন বিলীন করেছেন সারাজীবন তেমনি তার আসল নামটাও ঢাকা পড়েছে মওলানা এবং ভাসানী টাইটেলের মাঝে। মূলত তখনকার সময়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির নামের আগে মওলানা বসানো হতো। জীবনে অনেকেই তাকে জিজ্ঞেস করেছেন তার নামের আগে মওলানা কেন, ব্যক্তি বুঝে তিনি জবাব দিতেন।

যেমন, একবার মাদ্রাসা থেকে ডিগ্রি প্রাপ্ত একজন মওলানা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হুজুর, আপনিও মওলানা, আমরাও মওলানা; আমাদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? তিনি মুহূর্তের মধ্যে বললেন, ‘তোমরা সেই মওলানা যারা দূরে শয়তান দেখলে ‘লা হাওলা ওলা’ পড়, আমরা সেই মওলানা যারা শয়তানকে আগে কাছে ডাকি তারপর শয়তানের ঘাড়ের ওপর সওয়ার হয়ে শয়তানকে দিয়ে আমাদের কাজ করায়ে নেই।’ অন্যদিকে ভাসান চরে জীবনের প্রথম সম্মেলন করে পরিচয় পেলেন ভাসান চরের মওলানা, ভাসানীর মওলানা, অতপর মওলানা ভাসানী।

পরবর্তী সময় তার নামের আগে যুক্ত হয়েছে মজলুম জননেতা, আপোষহীন নেতা, Prophet of Violence, The Red Mawlana, The Fire-eater Mawlana, Prophet of Independence ইত্যাদি। আজীবন মওলানা ভাসানী ছিলেন মজলুমের ত্রাণকর্তা। তার কাছে জালিমের যেমন কোনো জাত-ধর্ম থাকত না, তেমনি মজলুম মানুষ কোনো ধর্মের, দেশের, বর্ণের, পেশার সেটা তিনি বিন্দুমাত্র ভাবতেন না। তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে অনেক বড় হয়েছেন, ব্যতিক্রম হয়েছেন এইজন্যই যে, তিনি থাকতেন সব হারাদের মাঝে, স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির কাছে। ভাসানী-কর্মী কবি বুলবুল খান মাহবুব তার ‘চর ভাসানের মওলানা নেই’ কবিতায় মওলানার শেষ ইচ্ছা তাই এভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন-

শ্রদ্ধায় নতজানু পৃথিবীর অশ্রু ভেজালো পা’
শুধু তিনি হেঁটে চললেন অন্তহীন আলোর পথ ধরে
বললেন, ‘তোমরা ভালো থেকো’ ।
শতাব্দির ফেলে আসা গাঢ়তম অন্ধকার থেকে
প্রতিধ্বনি ফিরে এলো -ভালো থেকো
হে আমার আত্মজেরা, হায়ানার মুখোমুখি, শ্বাপদের উদ্যত থাবায়
জীবনের দৃঢ় আশ্বাসে   
চিরদিন ভালো থেকো মানুষের অধিকার নিয়ে ।

সূত্র-  ১) মওলানা ভাসানীর জীবন ও মিশনের কর্মী সৈয়দ ইরফানুল বারীর বক্তব্য
        ২) মওলানা ভাসানী রিসার্চ সেন্টার প্রণীত ‘প্রশ্নোত্তরে মওলানা ভাসানী’

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন