জাতীয় ঐক্য, গোয়েবলসের কিবোর্ড ও এনেইবলার

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১০:১১:৩১

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট : বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে বেশ কিছুদিন ধরেই একটি জাতীয় ঐক্য গঠনের কথা বেশ জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে। আমি শুধু ভাবছি, যেখানে ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’–এর কোরাস আর ‘এনেইবলার’দের হুক্কাহুয়া যথেষ্ট সক্রিয় সেখানে কি আদতেই জোরালো কোন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে উঠতে পারবে? রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্পেষণ, গুম, হত্যা এসবের কথা এই আলোচনাতে আনছি না। তিনি বলেন, আমি মনে করি ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ এবং ‘এনেইবলার’ ছাড়া শুধুমাত্র গুম-হত্যা-নির্যাতনের মাধ্যমে এত এত ব্যাংক লুট, সোনা লুট, কয়লা লুট, ভোট লুট করে অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা কখনোই সম্ভব নয়।

তাই ফ্যাসিবাদের এই দুই অস্ত্র, ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ এবং ‘এনেইবলার’ সম্পর্কে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। আজকের লেখায় এই দুটি বিষয়কেই মূলত তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আশার কথা হচ্ছে ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ এবং ‘এনেইবলার’দের প্রবল কার্যকারিতা থাকা স্বত্বেও সাম্প্রতিক কোটা আন্দোলনে এবং বিশেষ করে স্কুল শিশুদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এতটাই বেশী ছিল যে ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ এবং ‘এনেইবলার’ এ দুইয়ের সমন্বিত দুষ্টচক্রটি এক্ষেত্রে হালে তেমন পানি পাননি। এই দু’টি আন্দোলন আমাদেরকে যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল যে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য হলে হবেনা, বরং সমস্ত জনগণকেই একসাথে মাঠে নামতে হবে।

মনে হচ্ছে এছাড়া এই গুম-খুন চালিয়ে যাওয়া লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আর অন্য কোন উপায় নেই। জানতে পারলাম ড. কামাল হোসেন তাঁর জীবনের শেষ কাজ হিসেবে এই জাতীয় ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়ায় পা বাড়িয়েছেন। সাথে এগিয়ে এসেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী। শোনা যাচ্ছে যোগ দিতে পারে বিএনপি’র নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট এবং আরো অনেকেই। ড. ইউনুসও না কি যোগ দিতে পারেন। আগামী ২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে আহুত সমাবেশ থেকে এ জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা দেওয়া হবে। তবে এই জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা পুলিশের গ্রেফতার, গুলি বা গুম-খুন নয়। সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ এবং ‘এনেইবলার’।

পাঠকরা অনেকেই হয়তো জানেন তবুও আজকের এ লিখায় ফ্যাসিবাদের এই দুটো প্রধান অস্ত্র সম্পর্কে কিছুটা বিস্তারিত বলার চেষ্টা করবো। কিন্তু তার আগে জাতীয় ঐক্যের স্বরূপ নিয়ে দুটো কথা বলে নেওয়া দরকার। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের জন্য সবাইকে এক ব্যানারে আসতে হবে, সবাইকে একই স্লোগান দিতে হবে, সবাইকে একই আদর্শ বা মতের হতে হবে তা কিন্তু রাজনীতি শাস্ত্রের কথা নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে রাজনৈতিক কর্মকান্ডেও এমন আজগুবি কিছু দেখা যায় না। তবে সবার লক্ষ্য এক হতে হবে। রাজনীতিতে ঐক্য কিংবা জোটের মর্মার্থ হলো এটিই। বৃটিশ বিরোধী আন্দলোনের কথাই ধরুন। তখন একদিক থেকে স্লোগান উঠত, “নারায়ে তাকবির” আবার অন্যদিক থেকে শোনা যেত, “বন্দে মাতারম”।

এরা সবাই কিন্তু এক ব্যানারে আন্দোলন করেনি, সেটা সম্ভবও ছিলোনা। কিন্তু সবার লক্ষ্য ছিল ‘বৃটিশ খেদাও’। ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যকান্ডের কথা আমরা সবাই জানি। সেদিন অসংখ্য শিখ ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ এবং শিশুরা একত্রিত হয়েছিল অমৃতসরে ডা. সাইফুদ্দিন কিচলুকে গুম করার প্রতিবাদে। এই প্রতিবাদ করতে গিয়ে তারা অকাতরে জীবনও দিয়েছিল। নাম শুনেই বুঝতেই পারছেন ডা.সাইফুদ্দিন কিচলু কোন শিখ ধর্মাবলম্বী নেতা ছিলেন না। কিন্তু তাদের সবার ধর্ম, বর্ণ, স্লোগান, ব্যানার আলাদা থাকলেও লক্ষ্য ছিল এক। তারা জানত আজ কিচলু গুম হয়েছে, কাল তাদের একজনকে করা হবে। এমন উদাহারণ আরও অনেক টানা যাবে। যেমন ১৯৫২ সালে ধর্মপ্রান তমুদ্দুন মজলিসের ভাষা আন্দোলনের ডাকে বামপন্থীরাও যোগ দিয়েছিল।

তাদেরকে ব্যানার পরিবর্তন করতে হয়নি, আদর্শ ত্যাগ করতে হয়নি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং ১৯৫৪, ৬৯ বা ৯০ এর গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের দিকে তাকালেও একই দৃশ্য আমরা দেখতে পাই। ব্যানার ছিল ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু লক্ষ্য ছিল এক। মজার বিষয় হচ্ছে, ভিন্নতা স্বত্বেও একই লক্ষ্য নিয়ে সবাই যখন মাঠে নামে, শোষক শ্রেণী তখন ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ কে নির্দেশ দেয় বিভক্তির সুর বাজাতে। আর কিবোর্ডের ‘কি’ গুলো একই সুরে বার বার বলতে থাকে, “তুমি অমুকের সাথে কেন?” অমুক তো যবন, তমুক তো কাফের, অমুক রাজাকার, তমুক নাস্তিক। কিবোর্ডের এই ‘কি’ গুলো সুরের মুর্ছনায় বিভিন্ন ট্যাগ ব্যবহার করে বিভক্তি এবং বিদ্বেষের সৃষ্টি করে মূলত জনগণের আন্দোলনকে দমন করে দিতে চায়। আর এর সাথে তাল মিলিয়ে এক বিশেষ ধরনের ‘এনেইবলার’দেরকে বলতে দেখা যায়, “তুমি অমুকের সাথে থাকলে আমি কিন্তু নাই”।

এনেইবলারদের অনেকগুলো প্রকারভেদ আছে, ধরন আছে – সে কথায় একটু পরেই আসছি। প্রথমে ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ সম্পর্কে একটু জেনে নিই। ‘গোয়েবলসের কিবোর্ড’ ফ্যাসিস্টদের ধর্মগুরু হচ্ছে পল জোসেফ গোয়েবলস। ফ্যাসিবাদকে সফলভাবে চালু রাখতে ফ্যাসিস্টদের জন্য তার অসংখ্য স্বর্গীয় বানীর একটি হচ্ছে, “Think of the press as a great keyboard on which the government can play” এ কথার অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, সংবাদ মাধ্যমকে নিজের কী বোর্ড বানাও,যেমন খুশি তেমন সুর বাজাও। ফ্যাসিস্টদের জন্য সংবাদ মাধ্যম সংক্রান্ত তার আরেকটি স্বর্গীয় বানী হল, “Give me the media and I will make of any nation a herd of swine” অর্থাৎ- “আমাকে গণমাধ্যম দাও, আমি যেকোন জাতিকে শুয়োরের পাল বানিয়ে দেব”।

গোয়েবলসের স্বর্গীয় বাণী অনুসরণ করে দেশের প্রায় সমস্ত গণমাধ্যমকে কিবোর্ডের “কি” বানিয়ে ইতিমধ্যেই নিজেদের আঙুলের তলায় নিয়ে আসা হয়েছে এবং যখন যে সুর প্রয়োজন তা বাজানো হচ্ছে। গণমাধ্যমগুলো এখন জনগণের কথা না বলে ভারতের হাতি আটকে যাওয়া নিয়ে ভীষন ব্যাস্ত থাকে। প্রশ্ন আসতে পারে এটা কিভাবে সম্ভব হল। এ বিষয়ে আরেক স্বৈরাচার মিসরের বর্তমান শাসক আল-সিসির একটি কথা মনে পড়ে গেল। ক্ষমতা দখলের পরপরই মিডিয়াকে কিবোর্ড বানানোর ব্যাপারে আল-সিসি তার সাঙ্গপাঙ্গদেরকে বলেছিলেন, যাদের টাকা দিয়ে কেনা যায় এবং যাদেরকে ভয় দেখিয়ে বসে রাখা যায় তাদেরকে নিয়ে আমি চিন্তিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ