আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, কোন পথে যাচ্ছে যুব সমাজ!

প্রকাশিত: ২৭ মার্চ, ২০১৮ ০১:৩২:০৪

হাসানুর রহমান: বর্তমান সময়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী দেখা যাচ্ছে তা হলো তরুনদের মাঝে আকাশ সংস্কৃতির বিস্তার। দিন দিন এটি মহামারীর মত বেড়েই চলেছে। এই নৈতিক অবক্ষয়ের একটি প্রধান কারন হচ্ছে আকাশ সংস্কৃতির বিষাক্ত ছোবল।

সংস্কৃতি একটি জাতি ও রাষ্ট্রের দর্পণস্বরূপ। এই সংস্কৃতির মাধ্যমেই একটি জাতি ও রাষ্ট্র বিশ্বের দরবারে তাদের গৌরব ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে পারে। কিন্তু বর্তমানে আমরা নিজস্ব সংস্কৃতি ভূলে ভীনদেশী সংস্কৃতির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। বিশ্বায়নের যুগে এসে বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসের সুবাদে আকাশ সংস্কৃতি নামে অনুন্নত দেশের সংস্কৃতিকে গ্রাস করছে উন্নত দেশগুলোর সংস্কৃতি। ফলশ্রুতিতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তাদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা হারাচ্ছে।

সাধারনত ডিজিটাল প্রযুক্তির অব্যবহারের মাধ্যমেই আকাশ সংস্কৃতির বিস্তার বেশি হচ্ছে। বিশেষত মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুক ও হিন্দি চ্যানেলের অপব্যবহার। এছাড়া তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর অন্যান্য মাধ্যমের ভয়ানক আগ্রাসন তো আছেই! এসকল প্রযুক্তির প্রতি যুব সমাজের আসক্তি দিন দিন বাড়ছে বৈ কমছে না।মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা,ইন্টারনেটে পর্ণগ্রাফির সয়লাভসহ যৌন সুড়সুড়িমূলক নানা আইটেম পেয়ে আমাদের যুব সমাজ নৈতিক অধঃপতনের চরম দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে।

বাংলাদেশে আকাশ সংস্কৃতির ইতিবাচক দিক অপেক্ষা নেতিবাচক দিকই বেশি। আকাশ সংস্কৃতির করাল গ্রাসে আজ আমাদের পরিবারের বন্ধন নষ্ট হচ্ছে। পশ্চিমা সমাজের বিবাহবন্ধনহীন অনৈতিক জীবনব্যবস্থা আমাদের দেশের জনগণকে প্রভাবিত করছে। ফলশ্রুতিতে চরম সামাজিক অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে। আমরা সমাজে লক্ষ করছি বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

আকাশ সংস্কৃতির মাধ্যমে বিদেশি সংস্কৃতির ব্যাপক আগ্রাসনের ফলে আমাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ ও খাদ্যাভাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তাছাড়া এটি আমাদের জীবনবোধ, নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুভূতিতে ব্যাপক আঘাত হানছে। ফলশ্রুতিতে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার ফলে সমাজে অন্যায়-অবিচার যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি জটিল রোগের সৃষ্টি হচ্ছে।

আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের যুব সমাজের মাঝে বাড়ছে হতাশা, যার ফলে তারা নানাপ্রকার সহিংসতা,সন্ত্রাসী কার্যক্রম,মাদক চোরাচালান,নারী নির্যাতন ইত্যাদি কার্যক্রমে জড়িয়ে তাদের উজ্জল ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে।

বিশিষ্ট শিল্পী ও কলামিস্ট ওবায়দুল হক সরকার  আমাদের যুব সমাজের বর্তমান অবস্থা দেখে আর্তনাদ করে বলেছেন: “আমাদের শিক্ষাঙ্গন আজ রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছে, মাস্তান-চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে উন্নয়ন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, মঙ্গল প্রদীপ মার্কা সংস্কৃতির ধাক্কায় আমরা প্রতিপদে শুধু পিছিয়ে পড়ছি।”

আকাশ সংস্কৃতির মাধ্যমে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। অপরদিকে উন্নত দেশগুলো স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তাদের সাংস্কৃতিক ধ্যান-ধারণা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোর দুর্বল সংস্কৃতি পাশ্চাত্যের তথাকথিত উন্নত সংস্কৃতির আগ্রাসনে ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের মত অনুন্নত দেশগুলোর নিজস্ব সংস্কৃতি বিলুপ্ত হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো তাদের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে অনুন্নত দেশগুলোকে শাসন করছে।

বর্তমানে গোটা পৃথিবী একটি বিশ্ব গ্রামে পরিণত হয়েছে যেটাকে আমরা গ্লোবাল ভিলেজ বলে থাকি। সুতরাং এই পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে এই বিশ্ব গ্রামের বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। সেজন্য এই ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও স্বার্থকে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করতে হবে। বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন হতে নিজস্ব সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হলে আমাদেরকে বিদেশি সংস্কৃতির ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করতে হবে এবং নেতিবাচক দিকগুলো বর্জন করতে হবে।

সে জন্য বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমাদেরকে আরও বেশি দক্ষতা অর্জন করতে হবে। দেশীয় সংস্কৃতির লালন আর বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হলে দেশীয় সংস্কৃতিকে আরও যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। বর্তমানে চালু আমাদের স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর সম্প্রচারে আরও বৈচিত্র্য আনয়নের পাশাপাশি নতুন নতুন স্যাটেলাইট চ্যানেল চালুর পদক্ষেপ নিতে হবে।

আকাশ সংস্কৃতি থেকে আমাদের যুব সমাজকে মুক্ত করার জন্য তাদেরকে সুস্থ সংস্কৃতির দিকে অগ্রসর করতে হবে।তারা যেন মোবাইল ফোন, ফেসবুক, ইন্টারনেটসহ অন্যান্য সকল মাধ্যম ব্যবহারে আরও বেশি সচেতন হয় সেদিকে আমাদের অবশ্যই নজর দিতে হবে।তাদের জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।

আকাশ সংস্কৃতির করালগ্রাসে বর্তমানে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো নাজেহাল। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের ফলে অনুন্নত দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সেজন্য আমাদেরকে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের যুব সমাজকে আকাশ সংস্কৃতির এই করালগ্রাস থেকে রক্ষা করার এখনই সময়। আর এটা করতে যদি আমরা ব্যর্থ হই তবে আমাদের যুব সমাজ ধ্বংসের অতল গহঃবরে হারিয়ে যাবে।

প্রজন্মনিউজ২৪.কম

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন