বিদায়ী বছরের দুর্ভোগ-দুর্নীতির বিষণ্নতা!

প্রকাশিত: ০৫ জানুয়ারী, ২০১৮ ১২:২২:১১

গোলাম মাওলা রণি: ২০১৭ সালটি আমাদের জাতীয় জীবনে যে কতটা কুলক্ষণা ছিল, তা টের পাওয়া যাবে আগামী বছরগুলোতে। অব্যাহত বন্যা, অতিবৃষ্টি, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে যুক্ত হয়েছিল মানবসৃষ্ট নানা দুর্ভোগ দুর্গতির সমাহার। ব্যাংক ব্যবস্থায় সাগরচুরি, সিন্ডিকেট করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, অর্থপাচার, চোরাচালান, মাদক পাচার আদম পাচার প্রভৃতি নানা অপকর্মে বাংলার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। গুম-হত্যা-জখম, ছিনতাই-অপহরণ-চাঁদাবাজি, ঘুষ-দুর্নীতি-অবিচার-অনাচার প্রভৃতি কারণে পরিবার-সমাজ-সংসার ভরে গিয়েছিল বিষণ্নতার বিষবাষ্পে। নানা আন্তর্জাতিক টানাপড়েন, অর্থনৈতিক মন্দা ইত্যাদির সাথে যুক্ত হয়েছিল প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর স্রোতের মতো প্রবেশ।

২০১৭ সালে বাংলাদেশের মানুষ কেমন ছিল, তা সরকারি হিসাব দেখলে বোঝা যাবে না। রাজধানীর কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে ক্রোকারিজ মার্কেট, কাপড়ের দোকান, ইলেকট্রনিক পণ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে কসমেটিকসের দোকানের বেচাবিক্রির নমুনা দেখলেই আপনি অর্থনীতির হালচালের মোটামুটি চিত্র পেয়ে যাবেন। বিগত বছরে জন লোক ধনী হয়েছেন, তা বোঝার জন্য রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরের জুয়ার আসর, মদের দোকান আর ব্যয়বহুল প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিতে পারেন। এর বাইরে লন্ডন, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, দিল্লি কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের অভিজাত হোটেল, ক্যাসিনো, ডিসকো, রিসোর্ট, হাসপাতাল প্রভৃতি স্থানেও নব্যধনীদের অসংখ্য নাম দেখে আপনি হয়তো চমকে যাবেন। কারণ ২০১৭ সালে তাদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।

অর্থনীতির চিরাচরিত নিয়ম মোতাবেক যখন কোনো দেশে ধনীর সংখ্যা লাগামহীন বাড়ে, তখন তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে যায় দরিদ্রের সংখ্যা। ধনী দরিদ্রের নিধারুণ বৈষম্যের কারণে সমাজে বেড়ে যায় অন্যায়, অবিচার, হতাশা, জুলুমসহ নানাবিধ সামাজিক মানসিক রোগবালাই। আপনি যদি একবার সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর প্রভৃতি ভাটি অঞ্চলে যান, তবে ২০১৭ সালের উপর্যুপরি বন্যা, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং অকালবৃষ্টির তাণ্ডবে ক্ষতবিক্ষত কৃষকের রক্তাক্ত মেরুদণ্ড দেখতে পাবেন। এবার আপনি তার চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা দেখার জন্য উত্তরবঙ্গের নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা প্রভৃতি জেলায় বন্যাদুর্গত কৃষকের কুটিরগুলোতে ঢু মেরে আসতে পারেন।

দেশের দক্ষিণ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে কয়েক দফা জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় অতিবৃষ্টির কারণে নদীভাঙন, ফলসহানি, ঘরবাড়ি বৃক্ষসম্পদ নষ্ট হওয়ার কারণে এসব অঞ্চলের অর্থনীতির ওপর যে চাপ পড়েছে; তা রাজধানীতে বসে সুখসাগরে ডুব দিয়ে ৩১ ডিসেম্বর রাতে আতশবাজির আগুনের হল্কা দেখে কেউ অনুমান করতে পারবেন না। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, খুলনা, মংলা নবনির্মিত গভীর সমুদ্রবন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য ওঠানামা এবং শ্রমিকদের হাঁকডাক দেখলেই অনুমান করতে পারবেন, সারা বছরের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য কেমন ছিল।

২০১৭ সালে বহু লোক বিদেশে গেছেন, কিন্তু সে তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে অনেক কম। অন্য দিকে সামগ্রিক রফতানি বাড়লেও সে ক্ষেত্রে পণ্যমূল্য কমে যাওয়ার কারণে রফতানি আয়ে দেখা দিয়েছিলনেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেশের প্রধান রফতানি খাত, গার্মেন্ট নানামুখী সমস্যায় বিগত বছরে মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। বিদেশী বায়াররা ছলচাতুরী করে পণ্যমূল্য কমিয়ে দিয়েছেন। অন্য দিকে, বায়ারদের জোট অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের যথেচ্ছাচারে শত শত গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে হাজার হাজার নয়, কয়েক লাখ শ্রমিককে পথে বসিয়েছে। অনেক ব্যাংক তাদের প্রদত্ত ঋণ খেলাপি ঋণে পরিণত করতে বাধ্য হয়েছে।

এরই মধ্যে গার্মেন্ট সেক্টরের কিছু সিন্ডিকেট অবৈধ কর্ম করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে। তারা নিজেদের মধ্যে আপসরফা করে দফায় দফায় সুতা ডেনিম কাপড়ের দাম বাড়িয়ে দিয়ে মরণাপন্ন গার্মেন্ট সেক্টরকেকবরে পাঠানো জন্য সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল।

বিগত বছরে আমাদের জাতীয় আর্থিক খাতগুলো বড়ই বেসামাল হয়ে পড়েছিল। ব্যাংক ব্যবস্থায় দুর্নীতি, অর্থলোপাট, কুঋণ, অবলোপনকৃত ঋণ এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ ধাঁ ধাঁ করে বেড়ে যাচ্ছিল। ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ প্রদানের সুদের হারের মধ্যে ছিল বিস্তর ফারাক। অন্য দিকে ব্যাংক ব্যবস্থাপনাব্যয় ক্রমেই বেড়েছিল। ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের অতিমাত্রায় ঋণ গ্রহণ এবং ব্যাংকগুলোর সরকারকে ঋণ দেয়ার অতি আগ্রহের কারণ, ব্যক্তিগত বিনিয়োগ ছিল খুবই নেতিবাচক। ফলে বিদায়ী বছরে দেশের প্রাইভেট সেক্টরে নতুন কোনো কর্মসংস্থান হয়নি বললেই চলে। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার অপরিবর্তিত থাকা এবং সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চিত খাতে সীমাহীনভাবে বিনিয়োগ করার কারণে সরকারকে যে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত সুদ পরিশোধ করতে হবে, তাতে দ্বিমুখী সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমত, মানুষের উৎপাদনশীলতা সৃজনশীল বিনিয়োগের অভ্যাস সুদ খাওয়া অলস হয়ে পড়ায় পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র সরকারকে অতিরিক্ত সুদের অর্থ নিজস্ব কোষাগার বা আয় থেকে জোগান দিতে হবে।

সরকারসমর্থক অর্থনীতিবিদেরা বিগত বছরে বারবার দেশের অর্থনীতির অশনিসঙ্কেত এবং ব্যাংক ব্যবস্থার দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেছেন- বাংলাদেশ ব্যাংক যদি সঠিকভাবে অডিট করে, তবে দেশের প্রতিটি ব্যাংক বিপদে এবং অনেকগুলো দেউলিয়া হয়ে পড়বে। তার সতর্কবাণী যে কতটা বাস্তবসম্মত, তা ইতোমধ্যেই বহুল সমালোচিত ফারমার্স ব্যাংকে অচলাবস্থা সৃষ্টির ঘটনা দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। বেসিক ব্যাংকের বাচ্চু, সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক, অগ্রণী ব্যাংকের মুন কেলেঙ্কারি ছাড়াও ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ এবং শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনা বিগত বছরের সারাটি সময় দেশবাসীকে যারপরনাই আতঙ্কিত, বিরক্ত বিক্ষুব্ধ করে রেখেছিল।

২০১৭ সালের সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ছিল, দেশের নিরুত্তাপ রাজনীতি। ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দল কার্যত ছিল চুপচাপ। উভয় দলের মনে লুকিয়েছিল রাজ্যের ক্ষোভ-বিক্ষোভ, মান-অভিমান পারস্পরিক বিদ্বেষ। রাজনীতির চিরায়ত কোলাহল, বিষোদগার মিছিল-মিটিং প্রভৃতি বাদ দিয়ে সব বেদনা মনের মধ্যে পুষে রাখার যে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, তা বিগত দিনে বিশ্ববাসী বহুবার দর্শন করার সুযোগ পেয়েছে। রাজনীতির মাঠের নীরবতা অনেকটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের ওপর জাজিম বিছিয়ে কোলবালিশে হেলান দিয়ে হুকো টেনে আয়েশ করে চোখ বুজে থাকার মতো আত্মঘাতী ভয়ঙ্কর বালখিল্য ঘটনা। কাজেই সেই ভয়াবহ নীরবতার সকরুণ শঙ্কায় বোধসম্পন্ন দেশবাসী সারা বছর আতঙ্কে কাটিয়েছেন।

রাজনীতির ময়দানের কোলাহল অকারণে এমনি বন্ধ ছিল না। অব্যাহত গুম, জেলজুলুম মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত করে ফেলা হয়েছিল সরকারবিরোধী শক্তিগুলোকে। ফলে তাদের মুখের প্রতিবাদের ভাষা, শরীরের প্রতিবাদ করার শক্তি এবং বুদ্ধিসুদ্ধিতে বিষণ্নতা নিষ্ক্রিয়তার বিষ সৃষ্টি হয়ে তা পুঞ্জীভূত হয়ে উঠেছে প্রত্যেকের হৃদয়ে। মানবহৃদয়ের বিষের উদগিরণ যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নিকট অতীতে বিশ্বের বহু জনপদে বহুবার দেখা গেছে। আর কারণেই ২০১৭ সালের অনেক ঘটনার দায় অনাগত দিনে কড়ায়-গণ্ডায় পরিশোধ করতে হবে। সে শঙ্কা নিয়েই দেশবাসী একের পর এক নতুন বছরে প্রবেশ করেছে।

সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বিভেদ-বিসম্বাদের বহু বীজ ২০১৭ সালে রোপিত হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবী বনাম প্রাইভেট চাকরিজীবী; সরকারদলীয় কর্মকর্তা বনাম সরকারবিরোধী কর্মকর্তা; সৎ কর্মকর্তা বনাম অসৎ দুর্নীতিবাজ-চরিত্রহীন কর্মকর্তা প্রভৃতি বহু শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে যে সমস্যাটি সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করেছে, তা হলো অর্থনৈতিক বিভক্তি। সাধারণ হিসাবে বলা হয়, বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ১০ শতাংশ সরকার বা রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে হয়ে থাকে। এর বেশির ভাগই অনুৎপাদনশীলসেবা খাতবলে পরিচিত। অন্য দিকে, বেসরকারি উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের খাত ৯০ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সৌদি আরবসহ অনেক দেশে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে, বেসরকারি খাতে ছাঁটাই, চাকরিচ্যুতি প্রভৃতিসহ মালিক-শ্রমিকের সম্মতিতে বেতনভাতা কমিয়ে দেয়া হয়েছে বহু দেশে।

বিশ্বে বিরাজমান অর্থনৈতিক চালচিত্রকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আমাদের সরকার তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা দ্বিগুণ করে দিয়েছেন; ইচ্ছেমতো পদোন্নতি দিয়েছেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক নিয়োগে প্রশাসনের মাথা ভারী করে ফেলেছেন। ফলে সচিবালয়সহ দেশের বিভিন্ন সরকারি দফতরে একটি পদের বিপরীতে একাধিক কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি হয়েছে। অপরিকল্পিত পদোন্নতির কারণে সৃষ্টি হচ্ছে কর্মকর্তাদের জট। আবার প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় নি¤œস্তরে জট সৃষ্টি হয়েছে। সরকার কর্তৃক কর্মকর্তাদের বেতনভাতা বৃদ্ধির ফলে মারাত্মক সমস্যায় পড়েছেন বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা কর্মচারীরা। কারণ তাদের বেতন এক পয়সা তো বাড়েইনি, বরং অনেকের কমেছে; এমনকি কেউ কেউ চাকরিও হারিয়েছেন।

অথচ পণ্যের বাজার, বাড়িভাড়া, পরিবহন ভাড়া, ঘুষেররেট’, চাঁদাবাজির হার প্রভৃতি বেড়েছে সরকারি চাকুরেদের বেতন বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে। এর পুরো দায় বহন করতে হচ্ছে বেসরকারি খাতকে।
এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ১০ শতাংশ সরকারি কর্তা বুক ফুলিয়ে বাজারে গিয়ে আগেভাগে সব কিছু বাড়তি দামে কিনে ফেলছেন। অন্য দিকে, বেসরকারি খাতের লোকেরা অবদমিত মনে বাজারে গিয়ে নিজেদের সীমিত আয় দিয়ে শুধু ততটুকু কেনার চেষ্টা করেন, যতটুকু না হলে নেহায়েত বেঁচে থাকা দায়। গত ছয়-সাত মাসে বিশেষ করে চাল-ডাল, পেঁয়াজ প্রভৃতির গগনচুম্বী দাম, টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি, ফার্নিচার ইত্যাদির আমদানি কেনাবেচা স্মরণকালের তলানিতে নেমে যাওয়া, বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, আবাসন শিল্পে মঙ্গা, নাটক-সিনেমা-সঙ্গীতসহ শিল্প-সংস্কৃতির স্থবিরতা, টেলিভিশন আর পত্রপত্রিকাসহ গণমাধ্যমগুলোর অর্থনৈতিক হাহাকারকে সমন্বিত করে কেউ যদি বিচার-বিশ্লেষণ করেন, তবে তিনি বুঝতে পারবেন বিদায়ী বছর কতটা দুর্ভোগ দুর্গতিময় ছিল জাতির জন্য।

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ