কলাম

গণমানুষের গণ-ভোগান্তী

প্রকাশিত: ১৬ অগাস্ট, ২০১৭ ০৫:২৩:২১

নিজস্ব প্রতিনিধি: লিফ্ট বন্ধ। তাই সিঁড়ি বেয়ে তিন তলায় এক বড় ভাইয়ের অফিসে পৌঁছলাম। সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করলাম। আমার সমবয়সী পরিচিত আরো দুজন ছিলেন সেখানে। বড় ভাই কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কি আর করা! নিরবতা বজায় রেখে ওদের সাথে কিছুক্ষণ বিনোদনে মজলাম। তাও আবার ফেইসবুকে প্রচলিত কিছু কমেডি ছবি নিয়ে। ভালোই মজা পেলাম। ওহ! আরেকটা কথা, বড় ভাইও কিন্তু আমাদের সাথে খানিকটা মজা ভাগ করে নিয়েছেন।

কিছুক্ষণ পর অন্য এক বড় ভাই তাকে কল দিয়ে এমপি’র অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য বলেন। মূলত, বড় ভাই দুজনই বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। পরে ক্যামেরা, ল্যাপটপসহ আমাদের ছোট তিনজনকে আগে-ভাগেই এমপি’র অনুষ্ঠানে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

এমপি’র অনুষ্ঠানের ভিডিও, ছবি ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করে যোহরের নামাজ আদায় করলাম। তখন দুপুর সোয়া ২টা বাজে। মসজিদ থেকে বের হয়ে দেখি বিশাল প্যান্ডেলের ভিতরে চলছে গণভোজন। জানতে পারলাম, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪২তম শাহাদাৎ বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে গণভোজের আয়োজন করেছেন সদর আসনের সংসদ সদস্য।

প্যান্ডেলের বাহিরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম। হাজার হাজার মানুষ। এক বেলা দু’মুঠো ভাত-মাংস খাওয়ার জন্য কত কষ্ট করতে হচ্ছে তাদের। একটি চেয়ারে বসতে পিছনে অন্তত ৩জনের সিরিয়াল পড়েছে । মাঝেমধ্যে, দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ গুলোকে প্যান্ডেলের বাহিরে নিতে স্বেচ্ছাসেবী কর্মীরা খুব জোরে মানুষের ভিড়ে ধাক্কা দিতেও দেখা গেছে।

এতে অনেকেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। গরমে খাবার পরিবেশনকারীদের ঘাম গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। পরিস্থিতির কারণে এক সারির খাওয়া শেষে নোংরা প্লেট-বাটি গুলো ভালো মতো পরিষ্কার ছাড়াই অপর সারিতে খাবার পরিবেশনে ব্যবহৃত হয়েছে। যা নিজের চোখে দেখলে কোনো নেতা কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তা সেখানে খাবার খেতেন না।

তবুও গরীব মানুষগুলো চরম ভোগান্তী মাড়িয়ে এক বেলা ভাত-মাংস খাচ্ছেন আবার কেউ কেউ দাঁড়িয়ে ছিলেন খাওয়ার অপেক্ষায়। জাতীয় শোক দিবসে দেশব্যাপি গণভোজের হিড়িক পড়ে এ বছর। পূর্বেও এমনটি ছিল। এবার নির্বাচনকে ঘিরে একটু বেশি বেশি হয়েছে সবখানেই। অনেক স্থানে রাস্তাঘাট বন্ধ করে গণভোজের প্যান্ডেল সাজাতে দেখা গেছে।

মূলত, রাস্তা বন্ধ করে জনগণকে ভোগান্তীতে ফেলে গণভোজের নামে আরেক ভোগান্তীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটু পিছনে তাকালে দেখা যায়, গণভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনেও ভোটারগণের ভোগান্তীর কমতি ছিল না। সূর্যের তাপ কিংবা কনকনে শীত উপেক্ষা করে ভোট কেন্দ্রে লম্বা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকেন নারী, বৃদ্ধাসহ সব বয়সী ভোটারগণ।

অথচ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর জনপ্রতিনিধিদের সাক্ষাৎ পেতে সেই একই সিরিয়াল ধরেও ব্যর্থ হচ্ছেন জন সাধারণের অনেকেই। অন্যদিকে, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে টেন্ডারবাজী, চাঁদাবাজীর সাথে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত রাজনৈতিক নেতারা। জেলেদের প্রাপ্য ভিজিএফ কার্ডের চাল আত্মসাৎ করতেও দ্বিধাবোধ করেন না নেতাদের অনেকেই।

চাকুরীর ক্ষেত্রেও জনগণকে এসব নেতাদের সুপারিশ কিনে নিতে হচ্ছে হয়রানি আর টাকার বিনিময়ে। । এ বছর বন্যা দুর্গতরা সহায়তার জন্য পানিতে দাঁড়িয়ে সিরিয়াল ধরতে দেখা গেছে। আপনি দেখবেন, গণমানুষের সকল কাজের ক্ষেত্রেই হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়। কিন্তু কেন এমনটি হয়?

এ বছর বঙ্গবন্ধুর কুলখানীর জন্য এক নেতা ১২০টি গরু জবাই দিয়েছেন। এছাড়াও নিজেদের ইচ্ছামতো বিভিন্ন স্থানে গরু জবাই দিয়েছেন অন্যান্য নেতারা। পত্রপত্রিকার মাধ্যমে সংবাদ গুলো পৌঁছে গেছে সবখানে। এতটুকুই নেতাদের চাওয়া আর জননেত্রীর বাহবাহ কুড়িয়ে নেয়া হলো তাদের পাওয়া।

তাই গণভোজে জনগণের কি সুবিধা-অসুবিধা হচ্ছে তা দেখার প্রয়োজনবোধ করেন নি নেতাদের কেউই। কারণ এ সব নেতারা একদিনে জনগণের জন্য কোটি টাকা উৎসর্গ করার বিপরীতে বছরের প্রতিটি দিন বিভিন্নভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার কোটি টাকা।

ভাবতে অবাক লাগে, বছরের ৩৬৪ দিন জনগণকে ভোগান্তীতে রাখেন যারা জাতীয় শোক দিবসে গণভোজের মাধ্যমে ওই দিনও হতদরিদ্র মানুষ গুলোকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি তারা। যদি এসব নেতারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে মন থেকে ভালোবাসতেন, তাহলে শুধুমাত্র বছরের এই দিনটিতেই এতো আবেগ, ভালোবাসা আর পাগলামি দেখাতেন না তারা।

সারা বছরের  ভালোবাসা একদিনে নাকে-মুখে মেখে দিতেন না তারা। অথচ, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। এসব নেতারা বঙ্গবন্ধুকে যদি সত্যিই ভালোবাসতেন তবে শুধু একদিন নয় বছরের প্রতিটি দিন তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে দেশের সর্ব ক্ষেত্রে জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেন।

জনগণের বিন্দুমাত্র অধিকারও হরণ করতেন না তারা। অথচ বছরের ৩৬৪ দিনই বিভিন্নভাবে এসব নেতারা জনগণের অধিকার হরণে লিপ্ত রয়েছেন। শুধুমাত্র একদিন জাতির জনকের স্মরণে জনগণের জন্য লোক দেখানো কিছু করেন এসব নেতাগণ। কিন্তু তাতেও অধিকার বঞ্চিত থেকে যায় আমজনতা।

প্রজন্মনিউজ২৪/রাকিব/কেএম লুৎফর

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন