৯ হাজার ৮৮৬ ডাকঘরের বেহাল দশা

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০১৭ ১১:৪০:২৮ || পরিবর্তিত: ২১ জুলাই, ২০১৭ ১১:৪০:২৮

 ‘রানার ছুটেছে তাই ঝুম্ঝুম্ ঘণ্টা বাজছে রাতে/রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে’- কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য যুগের সেই রানার আছে আজও। আছে ডাক হরকরা। ডাক বাক্সগুলোও চোখে পড়ে; কিন্তু কারো যেন কোনো ব্যস্ততা নেই। নেই কোনো তাড়াহুড়ো।

কেন ব্যস্ততা নেই- এ প্রসঙ্গে ডাক বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অভিমত, প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে ডাক বিভাগ। এখানে কেউ চিঠির খোঁজ নিতে আসে না। তাই কর্মীদেরও চিঠি পৌঁছে দেয়ার নেই কোনো তাগিদ। অলস সময় কাটে সকলের। 

অথচ এককালে ডাক বিভাগ ছিলো যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। চিঠি, পণ্য পার্সেল, টাকা পরিবহনে একমাত্র ভরসা ছিলো ডাক বিভাগ। ষাটের দশকে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ আওতাবহির্ভূত এলাকার পোস্ট অফিসে ছিল টেলিগ্রাম ব্যবস্থাও। কিন্তু প্রযুক্তির অতল গর্ভে হারিয়ে গেছে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা। এখন আর কেউ টেলিগ্রাফের ধার ধারে না।  দ্রুত ধাবমান জীবনে চিঠি লেখার অবকাশ কোথায়! আর মানি            অর্ডারে টাকা পাঠানো এখন মৃত ইতিহাস। মোবাইল, এসএমএস, ই-মেইল আর ফেসবুক, ভাইবার, স্কাইপি, ইমু, হোয়াটসআপ সবার হাতে হাতে। এক নিমিষেই যুক্ত হওয়া যায় লাইভ কথোপকথনে। মানি অর্ডারের বদলে মোবাইল ফোনে মানি ট্রান্সফার। অফিসিয়াল চিঠি ও ডকুমেন্ট পাঠাতে কুরিয়ার সার্ভিস। এই অবস্থায় বাংলাদেশের ডাক ব্যবস্থা ঘুরে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে বটে। তবে তার গতি আশাব্যঞ্জক নয়। দেশে দেশে আধুনিক ডাকসেবায় ই-কমার্সের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে আমেরিকার ডাকসেবার বাত্সরিক আয় ছিল প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলার, যেখানে প্রতিষ্ঠানটি ১৫৫ বিলিয়নের উপরে মেইল গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করেছে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ডাক সেবার সরবরাহ বেড়েছে ৪৮ শতাংশ।

এখন বাংলাদেশের ডাক বিভাগের বড় ক্রান্তিকাল চলছে। সেবা দৈন্যতায় ধুঁকছে ৯ হাজার ৮৮৬টি ডাকঘর। দেড় দশকে ডাক বিভাগে চিঠি বিলির সংখ্যা কমেছে ২০ কোটি। প্রতি বছরে গড়ে ২০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে। গত ৭ বছরে লোকসান দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। চলতি অর্থবছরও (জুন পর্যন্ত) ২৫৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৪৮৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এর আগের বছর লোকসান হয়েছে ২২৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। একইভাবে ২০১২-১৩ অর্থবছরে লোকসান ১৭৭ কোটি ১৩ লাখ, ২০১১-১২তে ২০০ কোটি ৬৯ লাখ ও ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে লোকসান গুনতে হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সালে ২৪ কোটি ৪ লাখ ২৭ হাজার চিঠি বিলি করে ডাক বিভাগ। এখন তা নেমে এসেছে ৫ কোটির নিচে। বর্তমানে সারা দেশে ডাকঘরে কর্মরত ৩৯ হাজার ৯০৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সুদিন যাচ্ছে না। এদের প্রায় ২৪ হাজার ভাতাপ্রাপ্ত কর্মচারীই হলেন রানার বা ডাকহরকরা। যাদের অবস্থা বড় করুণ।

পথের ধারে সুদৃশ্য পোস্টবক্স এখন খুব কমই দেখা যায়। রাজধানীতে চিঠি রাখার বাক্স মাটিতে দেবে যাচ্ছে। চারপাশে জন্মেছে আগাছা। নগরীর মোট ১৪০টি স্পটে বসানো হয়েছিল পোস্টবক্স। সামপ্রতিক সময়ে ১১টি স্পটের ডাকবাক্স তুলে নেয়া হয়েছে। কারণ তাতে চিঠি ফেলে না কেউ।

এই প্রতিকূল পরিবেশ-প্রতিবেশের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে লাভজনক হতে চায় এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি।

ডাক অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা বলেন, সাধারণ চিঠি কমে গেলেও বাড়ছে রেজিস্ট্রি চিঠি, পার্সেল ও দাফতরিক চিঠি। ডাক বিভাগ চিঠি সরবরাহের লক্ষ্যে ১১৮টি গাড়ি সংযুক্ত করেছে, যাতে জনগণের কাছে তাদের বার্তা দ্রুত পৌঁছে দেয়া যায়। গ্রামীণ পর্যায়ে ডাকঘর নির্মাণের একটি উদ্যোগ শুরু হয়েছে। আগামী এপ্রিলে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে। তবে জনবল সংকট রয়ে গেছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশের ডাক বিভাগের উন্নয়নের জন্য বর্তমানে ১৭টি প্রকল্প রয়েছে। সরকারি অফিসসহ প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ এখনো ডাকঘরের মাধ্যমে চলছে। বাড়ছে রেজিস্ট্রি চিঠি, পার্সেল ও দাফতরিক চিঠি। ডাকঘরে ১১টি মূল সেবাসহ মোট দুই ডজনেরও বেশি সেবা চালু রয়েছে। এসব সেবার মধ্যে রয়েছে দেশি-বিদেশি সাধারণ চিঠি, পোস্টকার্ড, রেজিস্ট্রি চিঠি, ডাকটিকিট বিক্রয়, পোস্টাল অর্ডার, মানি অর্ডার, পার্সেল, জিএমই (গ্রান্টেড মেইল এক্সপ্রেস), ইএমএস (এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিস), ভিপিপি (ভ্যালু পেবল পার্সেল) ইস্যু ও বিলি, ভিপিএল (ভ্যালু পেবল লেটার), বীমা পার্সেল, স্মারক ডাকটিকিট বিক্রি, মোবাইল মানি অর্ডার, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক, ডাক জীবনবীমা, সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম জমা, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নে টাকা পাঠানো ও নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বিক্রি।

ডাক বিভাগের কয়েকজন দায়িত্বশীল পদস্থ কর্মকর্তা জানান, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও আধুনিকায়নের কারণে এশিয়া মহাদেশের চীন, থাইল্যান্ড, ইউরোপের স্পেন, গ্রিসসহ অনেক উন্নত দেশে সরকারি ডাক বিভাগ এখনও লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে আছে। জাপান তাদের ডাক বিভাগের মাধ্যমে ই-কমার্স চালু করে সফল হয়েছে। বাংলাদেশেও ডাক বিভাগ আধুনিকায়নের লক্ষ্যে একাধিক প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। কিন্তু এক দশকেও কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। উন্নয়নের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এক মেয়াদ শেষে নতুন মেয়াদে নবায়ন করা হলেও দেখেনি আলোর মুখ। ধীরগতিতে চলা ডিজিটালাইজেশন প্রকল্পের এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হার মাত্র ১০ শতাংশ। ফলে এখন পর্যন্ত ডাক বিভাগের পরিবহন কাজ চলছে ট্রেন ও সরকারি স্টিমারে। যোগাযোগের জন্য এখনও ব্যবহূত হচ্ছে ল্যান্ডফোন। মান্ধাতা আমলের এমন যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ডাক বিভাগের চিঠি, পার্সেল, এমনকি টাকাও গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগছে দুই-তিন দিনের বেশি। অথচ ডাক বিভাগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসগুলো আধুনিক দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে লাভজনকভাবে ব্যবসা করে যাচ্ছে। বর্তমানে পার্সেল ও টাকা পাঠানোর চাহিদা বেশি। বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসগুলো এই ব্যবসা লুফে নিয়েছে।

একজন কর্মকর্তার দাবি- বিকাশ বা ই-ব্যাংকিং আধুনিক পদ্ধতিতে দ্রুত টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়,তাহলে সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবে ডাক বিভাগ।

জানা গেছে, ডাক বিভাগকে মাথা তুলে দাঁড়াতে প্রান্তিক পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দিতে পোস্ট অফিস ব্যাংকিংয়ের ব্যাপক বিস্তৃতির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাংকিং খাতের বাইরে যে জনগোষ্ঠী রয়েছে তাদের পোস্ট অফিসের মাধ্যমে সেবা দেওয়াই এর মূল লক্ষ্য। এখানে সঞ্চয়ী হিসাব খুলে, টাকা উত্তোলন ও জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া পোস্ট ই-সেন্টার ফর রুরাল কমিউনিটি শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে সাড়ে ৫ হাজারেরও বেশি ডাকঘরে ই-সেন্টার চালু করা হয়েছে।  ৮ হাজার ৫০০টি পোস্ট অফিসকে ই-সেন্টারে রূপান্তরের কাজ চলছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, পোস্ট অফিস ডিজিটালাইজেশন করা হচ্ছে। চীনে যেমন পোস্টাল সার্ভিস আধুনিকায়ন করা হয়েছে, বাংলাদেশেও করা হবে। কারো বাধায় পোস্ট অফিসের আধুনিকায়ন আটকে থাকবে না। উদ্যোগ নেয়া হয়েছে; বাস্তবায়ন সময়ের ব্যাপারমাত্র। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে আবার ঘুরে দাঁড়াবে ডাক বিভাগ।

তারানা হালিম বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল ফোন কোম্পানি টেলিটক সারাদেশে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ডাক বিভাগের ডিজিটালাইজেশন করবে। টাকা লেনদেনের ই-ক্যাশ সেবাসহ অন্যান্য প্রযুক্তিগত ও নেটওয়ার্ক সেবা দেবে। বিনিময়ে ডাক বিভাগ টেলিটকের চাহিদা অনুযায়ী দেশের ডাকঘরগুলোতে টেলিটকের গ্রাহকসেবা কেন্দ্র এবং নেটওয়ার্ক সমপ্রসারণের জন্য টাওয়ার স্থাপনের সুযোগ দেবে। এতে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ ছাড়াই সরকারি প্রতিষ্ঠান দুটি লাভবান হবে। এ ছাড়া ই-ক্যাশ সার্ভিস চালু করা হবে। উঠে দাঁড়াবে ডাক বিভাগ।

বর্তমানে সারাদেশে মোট ৯৮৮৬ টি পোস্ট অফিস রয়েছে। এরমধ্যে জিপিও ৪টি, এ- গ্রেড প্রধান ডাকঘর ২৩টি, বি-গ্রেড প্রধান ডাকঘর ৪৫টি, উপজেলা পোস্ট অফিস (ইউপিও) ৩৯৯টি, সাব-পোস্ট অফিস (এসও) ৯৪৫টি, অবিভাগীয় সাব-পোস্ট অফিস (ইডিবিও) ৩২২টি, বিভাগীয় শাখা পোস্ট অফিস (বিও) ১০টি, অবিভাগীয় শাখা পোস্ট অফিস (ইডিবিও) ৮১৩৮টি।

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ