বৃদ্ধাশ্রমে মায়েদের কান্না

প্রকাশিত: ১৪ মে, ২০১৭ ১০:৫২:৫২

মা যেমন সন্তানের সবচেয়ে বড় আশ্রয়, তেমনি বৃদ্ধ বয়সে সন্তানও মায়ের সবচেয়ে বড় নির্ভরতা। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে অনেক মায়েরই সৌভাগ্য হয় না সন্তানকে আঁকড়ে থাকার। এ ক্ষেত্রে বৃদ্ধাশ্রমই হয়ে ওঠে অনেক মায়ের শেষ আশ্রয়। কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে কেমন আছেন বৃদ্ধ মায়েরা? 

জুয়েলী বেগম (৭০)। স্বামী মান্নান শেখ মারা গেছেন প্রায় ২৫ বছর। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে নিজের এক বোনের বাড়িতে থাকতেন। ছেলে বিএ পাস করেছেন; বিয়েও করেছেন। কিন্তু বেশি দিন মায়ের সঙ্গে থাকেননি। মাকে ফেলে চলে গেছেন। জীবন সায়াহ্নে জুয়েলীর আশ্রয়স্থল এখন বৃদ্ধাশ্রম।

সন্তানের পরম প্রশান্তি ও ভরসার স্থল জুয়েলীর মতো অনেক মাকে আশ্রয় নিতে হয়েছে প্রবীণ নিবাসে। বেঁচে থাকার জন্য মৌলিক চাহিদা এখানে পূরণ হলেও সন্তানের স্নেহ-সান্নিধ্য ভুলতে পারছেন না মায়েরা। সন্তান দূরে ঠেলে দিলেও সারাক্ষণ সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন অবহেলিত এই মায়েরা।

জুয়েলী বেগম  বলেন, ঢাকার নারিন্দা এলাকায় তাঁর ছেলে একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন। সেখানে স্ত্রী ও মাকে নিয়ে একসঙ্গেই বসবাস করতেন। একদিন বেড়ানোর কথা বলে ছেলে ও ছেলের বউ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। এর কয়েক দিন পর তিনি জানতে পারেন, ছেলে ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে গেছেন। একদিন ওই ফ্ল্যাটের নতুন মালিক এসে সবকিছু জানতে পারেন। ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে তাঁকে গাজীপুরের ওই বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন তিনি।

অশ্রুসিক্ত নয়ন আর কান্নাজড়িত কণ্ঠে জুয়েলী বেগম বলেন, ‘মাকে একটু জায়গা দিলে ওদের কী এমন অসুবিধা হতো! তারপরও আমি তো মা; সব সময় চাই—আমার ছেলে ভালো থাকুক, আরও বড় হোক।’

জুয়েলীর মতো আরও অনেক মায়ের জায়গা হয়েছে গাজীপুর সদর উপজেলার মণিপুর বিশিয়া এলাকার বয়স্ক পুনর্বাসনকেন্দ্রে। কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক আবু শরীফ  বলেন, গাজীপুর সদরের মণিপুর বিশিয়া এলাকার খতিব আবদুল জাহিদ ১৯৮৭ সালে রাজধানীর উত্তরার আজমপুর এলাকায় ১২ কক্ষের একটি বাড়িতে কেন্দ্রটি স্থাপন করেন। ১৯৯৪ সালে কেন্দ্রটিকে মণিপুর বিশিয়ায় স্থানান্তর করা হয়। ১৯৯৫ সালে ২১ এপ্রিল শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী মাদার তেরেসা কেন্দ্রটির সম্প্রসারিত অংশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ওই সময় থেকেই কেন্দ্রটিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলেছে সন্তানের কাছে আশ্রয় না পাওয়া এমন শতাধিক বৃদ্ধা মায়ের। শিশুর শৈশবে নিজের সব সুখ বিলিয়ে দিয়ে সন্তানের মঙ্গল নিশ্চিত করতেন এই মায়েরা। সন্তানেরা সেই মায়েদেরই জীবন থেকে মুছে ফেলেছেন। অথচ সন্তানের মঙ্গল কামনায় দিন-রাত প্রার্থনায় রত এখানকার মায়েরা।

পাবনার চাটমোহর থানার নেংরী গ্রামের মৃত অরিস্টিন করাইয়ার স্ত্রী পরসী কুরাই (৮৫)।তাঁর চার-পাঁচ ছেলে, সবাই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু কেউ তাঁর খোঁজ-খবর রাখেননি। এলাকার লোকজন তাঁকে এই বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেন। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার কাঠরা গ্রামের মৃত জরু মিয়ার স্ত্রী ফরিদা বেগম (৮০)। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে।  নয় বছর ধরে তিনি আশ্রমে আছেন। কিন্তু একদিনের জন্যও তাঁকে দেখতে আসেননি সন্তানেরা।

কেন্দ্রের হোস্টেল সুপার (নারী) হাবিবা খন্দকার বলেন, ‘এখানে আশ্রয় নেওয়া প্রত্যেকেই যেন আমার মা। আমি তাঁদের সবাইকে মায়ের মতোই আদর-যত্নœকরি। মায়েদের সেবা-যত্নের চেষ্টা করা হলেও সন্তানের জন্য তাঁদের হাহাকার কোনো কিছুতেই দূর করা যায় না।’

কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. আবু শরিফ বলেন, বর্তমানে এই কেন্দ্রে বৃদ্ধ নারী ১০৮ ও পুরুষ ১০১ জন আছেন। অসহায় ও নিরুপায় বয়োজ্যেষ্ঠরা এ প্রবীণ নিবাসে বিনা খরচে থাকতে পারেন।

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ